
স্বদেশ মিয়ানমারে জান্তা বাহিনী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নৃশংস সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে জন্মভূমি ও ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দীর্ঘ ৯ বছর পার হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে শুরু হওয়া ইতিহাসখ্যাত সেই নির্মম মানবিক বিপর্যয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিশ্বের উদাসীনতা ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে থাকায় কক্সবাজারের ৩৩টি ঘিঞ্জি ক্যাম্প এবং নোয়াখালীর ভাসানচরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে ১২ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখে দিন পার করছেন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোতে মোট আশ্রিতদের অর্ধেকেরও বেশি নারী এবং প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি শিশু।
ক্যাম্পের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি উপত্যকায় ত্রিপল ও বাঁশ দিয়ে তৈরি গাদাগাদি ঘরগুলোতে পরিবারের সদস্যরা গাদাগাদি করে বাস করছেন। সেখানে ন্যূনতম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপদ খাওয়ার পানি বা স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার চরম অভাব রয়েছে। উপরন্তু, প্রতিবছর কালবৈশাখী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট তীব্র ঘূর্ণিঝড়, বর্ষাকালে বিধ্বংসী পাহাড়ি ধস ও আচমকা অগ্নিকাণ্ডের মতো প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয় শরণার্থীদের। প্রতিটি দুর্যোগের পর তাদের মাথার ওপর থাকা জীর্ণ ছাউনিটুকুও ধ্বংস হয়ে যায়, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে আরও দুর্বিষহ।

আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে মানবিক সহায়তার বরাদ্দ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসায় সংকট এখন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। খাদ্য সহায়তা ও আন্তর্জাতিক ডোনরদের বাজেট ছাঁটাইয়ের ফলে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর দৈনন্দিন খাদ্য ও মৌলিক চাহিদা মেটানোই এখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। আর এই সুযোগে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ও অপরাধী চক্র। মাদক চোরাচালান, মানব পাচার এবং রাতে ক্যাম্পের ভেতরে প্রতিপক্ষের ওপর হামলায় অস্ত্রের উন্মুক্ত ব্যবহারের কারণে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন অসহায় নারী ও কিশোরীরা। আলোর স্বল্পতা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে তারা প্রতিনিয়ত লিঙ্গভিত্তিক নানা ধরনের সহিংসতা ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার চরম ঘাটতির কারণে গর্ভধারণ এবং সন্তান প্রসবকালীন চিকিৎসায় প্রসূতি মা ও নবজাতকদের জীবনঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। দারিদ্র্য, পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অসফল চেষ্টা ও সামাজিক কুসংস্কারের কারণে ক্যাম্পজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বাল্যবিয়ে। কম বয়সে অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভধারণের ফলে কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা বহু পরিবারকে আরও গভীর শারীরিক ও মানসিক সংকটে ফেলছে।
ক্যাম্পের মোট জনমিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কিশোর-কিশোরী ও তরুণ। উপযুক্ত শিক্ষার অভাব, কাজের সুনির্দিষ্ট সুযোগ না থাকা এবং প্রত্যাবাসনের কোনো ইতিবাচক দিনক্ষণ দেখতে না পাওয়ায় বিশাল এই তরুণ সমাজ এখন চরম হতাশায় ভুগছে। একটি পুরো প্রজন্ম আজ দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক চাপ, ডিপ্রেশন ও মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।
এরকম এক অনিশ্চিত ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মধ্যেও সীমিত সম্পদ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের টানাটানির মাঝে কাজ করে যাচ্ছে মানবিক সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক মানবিক অংশীদারদের সাথে নিয়ে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) নারী, কিশোরী ও প্রসূতিদের জীবন রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছে।
সংস্থাটি বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সংলগ্ন স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ২৮টি ডেডিকেটেড কেন্দ্র চালু রেখেছে। যেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ ধাত্রীদের মাধ্যমে প্রসূতিদের চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব এবং মা ও নবজাতকের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া নারীদের নিরাপত্তা ও সহিংসতা প্রতিরোধে ৬৫টি বিশেষ সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, আইনি পরামর্শ, কেস ম্যানেজমেন্ট ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তরুণদের বাল্যবিয়ে ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে দেওয়া হচ্ছে জীবনমুখী কর্মসংস্থানমূলক নানা দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ।
দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। বিশ্বজুড়ে চলমান অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তার হাত দিন দিন গুটিয়ে এলেও, ইউএনএফপিএ ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি সংস্থার এই জরুরি চিকিৎসা ও সুরক্ষামূলক কার্যক্রমগুলোই এখন শরণার্থী শিবিরের হাজার হাজার নারী ও শিশুর টিকে থাকার একমাত্র আশ্রয়স্থল।
সূত্র : ইউএনএফপিএ