
সম্প্রতি প্রণীত ও প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক পরিচালক স্মৃতি সিংয়ের স্বাক্ষরিত চিঠিটি বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী বরাবর পাঠিয়ে এই উদ্বেগ জানানো হয়। ওই চিঠিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনগুলোতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার কথা বলা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি সতর্ক করে বলেছে যে, আইনগুলো সংশোধ না হলে তা অতীতে মানবাধিকার দমনে ব্যবহৃত দমনমূলক আইনগুলোর কালো ছায়া নতুন আইনগুলোতেও বজায় থাকবে এবং বাকস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক সুরক্ষার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
মানবাধিকার বিষয়ক এই চিঠিতে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদের পরিপন্থী বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আইন তিনটি হলো- প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬, বলপূর্ব গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬।
সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ :
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ অতীত সরকারগুলোর প্রয়োগ করা দমনমূলক আইনগুলোর ত্রুটি দূর করতে তো পারেইনি, বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে তা আরও জটিল ও মানবাধিকার পরিপন্থী করে তোলা হয়েছে।
তথ্য অপসারণ ও ব্লকিংয়ের অবাধ ক্ষমতা (ধারা ৮(২)) : প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কেবল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নয়, বরং সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্ত যেকোনো সংস্থা বা বাহিনীকে ডিজির (মহাপরিচালক) মাধ্যমে তথ্য অপসারণ, ব্লক বা সরিয়ে নেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘জনশৃঙ্খলা’, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট’ কিংবা ‘রাষ্ট্রের প্রতি অনাদর বা অবমাননা’র মতো অস্পষ্ট অজুহাতে যেকোনো কন্টেন্ট সরিয়ে নেওয়ার এই ক্ষমতা স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সাধারণ মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশকে স্তব্ধ করে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
মানহানি ও অবমাননার অস্পষ্ট সংজ্ঞা (ধারা ২৫): মানহানির সংজ্ঞাকে প্রসারিত করে তথ্য ‘মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা ক্ষতিকর’ হলেই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন (আইসিসিপিআর-এর ১৭ অনুচ্ছেদ) অনুসরণে অ্যামনেস্টি উল্লেখ করে, কোনো বক্তব্য সত্য হলেও তা কারো কাছে অপমানজনক মনে হতে পারে, কিন্তু কেবল সেই অজুহাতে তাকে অপরাধ গণ্য করা যায় না। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকা আবশ্যক, কারণ প্রতিষ্ঠানের মানহানি নিয়ে অপরাধমূলক ধারা প্রয়োগ যুক্তিযুক্ত নয়।
বিচারিক নিয়ন্ত্রণ বিলোপ (ধারা ৮(৪)): পূর্বে কোনো তথ্য ব্লক করার পর ৩ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদনের বাধ্যতামূলক আইনি বিধান ছিল। নতুন প্রস্তাবে এটি উঠিয়ে দিয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা সংস্থাকে তথ্য পুনর্বহালের আবেদন করতে বলা হয়েছে। এর ফলে স্বাধীন আইনি পর্যালোচনা ব্যবস্থা দুর্বল হবে এবং প্রশাসনিক (স্বৈরাচারী) সিদ্ধান্তের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
অপরাধীকরণ ও সাজা (ধারা ২৫ ও ২৬-এ): কন্টেন্ট তৈরি, সংরক্ষণ, প্রকাশ বা ছড়ানোর ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমে ‘আশঙ্কা’ তৈরি বা অপপ্রচারের অভিযোগে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকা (২৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড) পর্যন্ত জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। পূর্বে ‘অধিকার’-এর মতো বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠনের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালকে যেভাবে বিচারিক হয়রানির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, এই আইন পাস হলে তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ :
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ কর্তৃক আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদে অনুস্বাক্ষর এবং পরবর্তীতে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ গুমবিরোধী আইন পাস করাকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে এই আইনটির কয়েকটি ধারায় আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে স্পষ্ট সাংঘর্ষিক উপাদান রয়ে গেছে।
২৪ ঘণ্টার গোপনীয়তার সুযোগ (ধারা ৪) : আইনটির ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তার স্থান বা অবস্থান গোপন রাখা যাবে এবং একে ‘বলপূর্বক গুম’ হিসেবে গণ্য করা হবে না। অ্যামনেস্টি একে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে, কারণ গুম একটি নিরবচ্ছিন্ন অপরাধ এবং আটক ব্যক্তির অবস্থান গোপন রাখা তার আইনি সুরক্ষা হরণ করে।
সংজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা (ধারা ২-এইচ ও ৪) : আইনটিতে গুমের অপরাধ প্রমাণের জন্য যে কর্মকর্তা গ্রেপ্তার করেছেন এবং যিনি ঘটনা গোপন করছেন—তাদের একই ব্যক্তি হতে হবে বলে একটি অপ্রয়োজনীয় শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বাস্তবে গুমের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জড়িত থাকেন। এছাড়া গুমের ভুক্তভোগীর সংজ্ঞায় আন্তর্জাতিক সনদের (আর্টিকেল ২৪(১)) পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটেনি এবং সার্বজনীন এখতিয়ারের বদলে কেবল দেশীয় আদালতের আঞ্চলিক সীমার মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডের বিধান ও বিচারে বিলম্ব (ধারা ৬, ১৪ ও ১৯) : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও গুমের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া গুমের তদন্তের জন্য ৯০ থেকে ১২০ দিনের যে সর্বোচ্চ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা বড় ও জটিল গুমের ঘটনার সঠিক তদন্তে বাধা হতে পারে। পাশাপাশি আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারের সুযোগ রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
অভিযোগকারীদের ওপর শাস্তির খড়্গ (ধারা ২১): গুমের ‘মিথ্যা বা হয়রানিমূলক’ অভিযোগের জন্য অভিযোগকারীকে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। বলপূর্বক গুমের ঘটনায় প্রমাণ সংগ্রহ অত্যন্ত কঠিন; এমন অবস্থায় শাস্তির ভয় দেখালে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিচার চাইতে অনুৎসাহিত হবে।
এসআরবি আইন, ২০২৬ :
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের জন্য অভিযুক্ত বিতর্কিত বাহিনী ‘র্যা ব’-কে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশন। কিন্তু প্রণীত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬ পর্যালোচনা করে অ্যামনেস্টি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে-
কোনো ভেটিং ছাড়া জনবল স্থানান্তর: আইনটি মূলত র্যা বের নাম পরিবর্তন করে ‘এসআরবি’ করেছে মাত্র। কোনো প্রকার স্বাধীন মানবাধিকারমূলক ‘ভেটিং’ (বাছাই ও অতীত কর্মকাণ্ড তদন্ত) ছাড়াই র্যা বের সমস্ত কর্মকর্তা, জনবল, ক্ষমতা ও সম্পত্তিকে এসআরবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পুলিশি ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন (ধারা ১২, ১৫ ও ২৪): অপরাধের ইতিহাস থাকা একটি বিশেষায়িত বলকে তল্লাশি, আটক ও তদন্তের সাধারণ পুলিশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তদুপরি, এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত ‘গ্রিভেন্স রিড্রেস কমিটিতে’ খোদ এসআরবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের (যেমন: অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিচালক-আইন ও মিডিয়া) রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সদস্যদের কমিটিতে রাখা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যবস্থার পরিপন্থী।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কেবল নাম পরিবর্তন বা আংশিক আইনি সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা পূরণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজ দেশের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চায় এবং অতীতে ঘটে যাওয়া গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বাকস্বাধীনতা হরণের কালো অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি রূখতে চায়, তবে অবিলম্বে তিনটি আইনের বিতর্কিত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড-বিরোধী ধারাগুলো সংশোধন করতে হবে।