
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় শীতের আগেই ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও শহর। পানিতে ডুবে গেছে বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু, ভিজে গেছে বিছানাপত্র ও শীতের কাপড়। অন্যদিকে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোও বৃষ্টির কারণে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পর্যাপ্ত আশ্রয় উপকরণ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো ফিলিস্তিনি।
গাজার উত্তরাঞ্চলের আল-মিনা শরণার্থী শিবিরের ২৯ বছর বয়সী রানা আদনান হমেইদার পরিবারও এই দুর্যোগের শিকার। রাতভর বৃষ্টির পানিতে তাঁদের তাঁবু ডুবে যায়। ভিজে যায় পরিবারের বিছানাপত্র, কম্বল ও কাপড়চোপড়। দুই মাস বয়সী শিশুকন্যাকে ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে কোলে নিয়ে রাত কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
হমেইদা জানান, মধ্যরাত থেকেই স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন তিনি। তাঁবুর ভেতরে পানি ঢুকে সবকিছু ভিজিয়ে দেয়। সকালে দেখেন, তাঁর ছেলে ও ছোট মেয়েটি ঠান্ডায় কাঁপছে। ছোট শিশুটিকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করলেও তাঁবুতে পানি ঢোকা বন্ধ হচ্ছিল না। প্রবল বাতাসে তাঁবুটি উপড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
তাঁর স্বামী ৩০ বছর বয়সী সামেহ হমেইদা বলেন, সমুদ্রের খুব কাছে হওয়ায় তাঁদের তাঁবুটি ঝড়ের সরাসরি কবলে পড়ে। তাঁবুতে কোনো ত্রিপল বা তাপ নিরোধক উপকরণ নেই, যা দুর্যোগের সময় পরিবারটিকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারত।
গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও শহর প্লাবিত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া বহু ফিলিস্তিনির জন্য এটি চতুর্থ শীতকাল।
শনিবারের বৃষ্টিতে গাজার কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে পানির উচ্চতা ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়েছে। এ ঘটনায় গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা শত শত সহায়তার ফোন পেয়েছে।
আল-মিনা শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি পরিবারের বসবাস। বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ায় অনেক তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিবিরের মাটি পরিণত হয়েছে কাদাপানির জলাশয়ে।
৪০ বছর বয়সী রায়েদ আবু আমশার পরিবারও ঝড়ের কবলে পড়ে। তাঁর ভাষ্য, ঝড়ের সময় পরিবারের ওপর তাঁবুটি ভেঙে পড়ে। নিজের সন্তানদের পাশাপাশি প্রয়াত ভাইয়ের চার সন্তানসহ মোট নয় শিশুর দায়িত্ব তাঁর ওপর। ঝড়ে সবার কাপড় ও কম্বল ভিজে গেছে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য তাঁবু, ত্রিপল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ চেয়েছেন তিনি।
এদিকে মধ্য গাজার কয়েক দশক পুরোনো নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে স্থায়ী ভবনগুলোতেও বৃষ্টির কারণে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৫৪ বছর বয়সী নাসের আল-হাজ্জ থাকেন এমনই একটি বহুতল ভবনে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওপরের তলাগুলোর ধ্বংসাবশেষ তাঁর বাসার ওপর পড়ায় ছাদে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই সেই গর্ত দিয়ে ঘরে পানি ঢোকে।
ছাদটি ঠেকা দিয়ে মজবুত করার চেষ্টা করা হলেও একজন প্রকৌশলী ভবনটিকে বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছেন। সর্বশেষ ঝড়ের সময় সন্তানদের নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন আল-হাজ্জ। তাঁর দুই সন্তান অটিজমে আক্রান্ত। তারা ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে দূরে নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষে ঘুমায়।
আল-হাজ্জ বলেন, যেকোনো মুহূর্তে মাথার ওপর ভবনটি ধসে পড়তে পারে। কিন্তু বাড়িভাড়া অনেক বেশি এবং তাঁবুও নিরাপদ নয়। ফলে বিপদ জেনেও সেখানে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গাজায় বাস্তুচ্যুত প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। নিচু এলাকা ও উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি স্থানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করছেন বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকায়।
এ ছাড়া প্রায় ৪৪ হাজার ফিলিস্তিনি কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাজাজুড়ে ৪ হাজারের বেশি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শীতের আগে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৫০টি পরিবারের আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে মজুত থাকা সহায়তা উপকরণ দিয়ে এই চাহিদার মাত্র ১৮ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব।
ঝড় মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে গাজা পৌর কর্তৃপক্ষও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৫ কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালা এবং ২১২ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক। অচল হয়ে পড়েছে আটটি পানি নিষ্কাশন পাম্প স্টেশন এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহের তিনটি প্রধান জলাধার।
গাজা পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না জানান, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বর্তমানে সচল নিষ্কাশনব্যবস্থা দিয়ে মোট বৃষ্টির পানির সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে পানি নিষ্কাশনের নালাগুলো পরিষ্কার করার কাজ চলছে। পৌরসভার কর্মীরা নালা ও ম্যানহোল পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ, পানিপ্রবাহের পথ সচল রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশন লাইন মেরামত এবং পানির পাম্প চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তবে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটের কারণে নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
মুহান্না আরও জানান, শুধু গাজা সিটিতেই ২ হাজারের বেশি ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শহরটিতে ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ ২ কোটি ৫০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনাকারী কমিটিগুলোও আশ্রয় উপকরণের সংকটে পড়েছে। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের জরুরি কমিটির কর্মকর্তা আদলি আওয়াদ জানান, বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁবু ও ত্রিপল বিতরণের চেষ্টা করছেন তাঁরা। পাশাপাশি তাঁবুর চারপাশে পানি নিষ্কাশনের নালা খননেও পরিবারগুলোকে সহায়তা করা হচ্ছে। তবে সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা মজুত উপকরণের তুলনায় অনেক বেশি।
সব মিলিয়ে শীতের আগমনের সঙ্গে গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে আশ্রয়ের সংকট, অন্যদিকে বন্যা ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসের বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।
সূত্র: আল-জাজিরা।