
বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা ও জনমিতির মৌলিক কাঠামোতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রস্পেক্টস’-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সম্প্রতি ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টে বিশ্বের প্রধান ১২টি জনবহুল দেশের একটি তুলনামূলক চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের বার্ষিক জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যকার বিশাল তফাত। প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১২টি জনবহুল দেশের মধ্যে ১১টি দেশেই মৃত্যুর তুলনায় জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হলেও একমাত্র ব্যতিক্রম এশিয়ার পরাশক্তি চীন, যেখানে জন্মহারকে ছাপিয়ে গেছে মৃত্যুর হার।
শীর্ষস্থানে ভারত, চীনের বিপরীত চিত্র :
তালিকায় বার্ষিক সর্বাধিক জন্মহার নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে ভারত। এশিয়ার এই সমৃদ্ধ দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ নতুন শিশুর জন্ম হয়। বিপরীতে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৯৭ লাখ। সহজ হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রতি ১.৪ সেকেন্ডে একটি করে নতুন প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে। বিপুল প্রজননক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে দেশটি বিশ্বজুড়ে তাদের জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক এই ধারার একেবারে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে চীন। দীর্ঘ সময় বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল দেশের খেতাব ধরে রাখা চীনে বার্ষিক নতুন জন্ম প্রায় ৮৭ লাখ, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১ কোটি ১৭ লাখ। অর্থাৎ জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধানে চীনে প্রতি বছর স্বাভাবিকভাবেই প্রায় ৩০ লাখ মানুষের প্রাকৃতিক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৯৭৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা কঠোর ‘এক সন্তান নীতি’ এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জনসংখ্যার দ্রুত বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার কারণে এই সংকোচন ঘটছে। চীনের শ্রমশক্তির দ্রুত সংকোচন বৈশ্বিক উৎপাদন খাত এবং অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ও জনমিতির চিত্র :
দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল দেশ বাংলাদেশের জন্য এই বিশ্বজনমিতিক প্রতিবেদন তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের শীর্ষ ১২টি জনবহুল দেশের এই তালিকায় বার্ষিক জন্ম ও মৃত্যুর স্বাভাবিক ব্যবধানের বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান নবম।
জাতিসংঘের প্রাক্কলিত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লাখ ৪০ হাজার নতুন শিশু ভূমিষ্ঠ হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর জন্ম ও মৃত্যুর স্বাভাবিক ব্যবধানে দেশে প্রায় ২৫ লাখ ৪০ হাজার ইতিবাচক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য খাতের ধারাবাহিক উন্নয়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস পাওয়ার কারণে দেশে সার্বিক গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রজনন হার নাটকীয়ভাবে কমেছে। সত্তরের দশকে বাংলাদেশে প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ৬-এর ওপরে থাকলেও তা এখন ২ থেকে ৩-এ নেমে এসেছে, যা প্রায় রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের কাছাকাছি।
জনমিতিক সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি :
বর্তমানে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সুযোগ ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ উপভোগ করছে। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই এখন কর্মক্ষম তরুণ ও যুবক। প্রতি বছর ২৫ লাখের বেশি নতুন মানুষ জনসংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজার ও শ্রমশক্তি শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, জন্মহার এভাবে কমতে থাকলে আগামী তিন থেকে চার দশকের মধ্যে বাংলাদেশেও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। ফলে এখন থেকেই যথাযথ শিক্ষা, মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং বয়স্কদের চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত না করলে এই জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শীর্ষ ১২ দেশের জন্ম ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান:
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী প্রধান ১২টি দেশের প্রাক্কলিত বার্ষিক পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো (লাখে হিসাব করা হয়েছে)। ভারতে জন্ম ২ কোটি ৩১ লাখ, মৃত্যু ৯৭ লাখ ২০ হাজার (ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি)। চীনে জন্ম ৮৭ লাখ ১০ হাজার, মৃত্যু ১ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার (ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি)। নাইজেরিয়ায় জন্ম ৭৬ লাখ ৪০ হাজার, মৃত্যু ২৭ লাখ ৫০ হাজার (উচ্চ প্রবৃদ্ধি)। পাকিস্তানে জন্ম ৬৯ লাখ ১০ হাজার, মৃত্যু ১৬ লাখ ৪০ হাজার (উচ্চ প্রবৃদ্ধি)। গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে জন্ম ৪৫ লাখ ৬০ হাজার, মৃত্যু ৯ লাখ ৪০ হাজার (উচ্চ প্রবৃদ্ধি)। ইন্দোনেশিয়ায় জন্ম ৪৪ লাখ ৪০ হাজার, মৃত্যু ২২ লাখ (ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি)। ইথিওপিয়ায় জন্ম ৪১ লাখ ৮০ হাজার, মৃত্যু ৭ লাখ ৯০ হাজার (উচ্চ প্রবৃদ্ধি)। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম ৩৬ লাখ ৬০ হাজার, মৃত্যু ৩০ লাখ ৯০ হাজার (সংকীর্ণ প্রবৃদ্ধি)। বাংলাদেশে জন্ম ৩৪ লাখ ৪০ হাজার, মৃত্যু ৯ লাখ (ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি)। ব্রাজিলে জন্ম ২৫ লাখ ৩০ হাজার, মৃত্যু ১৫ লাখ ৩০ হাজার (ধীর প্রবৃদ্ধি)। মিশরে জন্ম ২৪ লাখ ৫০ হাজার, মৃত্যু ৬ লাখ (ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি)। তানজানিয়ায় জন্ম ২৪ লাখ ২০ হাজার, মৃত্যু ৪ লাখ (উচ্চ প্রবৃদ্ধি)।
আফ্রিকায় বিস্ফোরণ এবং এশিয়ার রূপান্তর :
বিশ্বের অপরাপর অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোতে জনসংখ্যার চিত্র একেবারেই আলাদা। তালিকায় থাকা সাব-সাহারান আফ্রিকান রাষ্ট্র নাইজেরিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি), ইথিওপিয়া ও তানজানিয়ায় জন্মহার মৃত্যুর তুলনায় বহুগুণ বেশি।
নাইজেরিয়ায় বছরে ৭৬ লাখ ৪০ হাজার নতুন জন্ম এবং ২৭ লাখ ৫০ হাজার মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ৪৯ লাখ মানুষ সেখানে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। সাব-সাহারান দেশগুলোতে নারীদের উচ্চ প্রজনন হার ও তরুণ জনসংখ্যার আধিক্য এর মূল কারণ। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৫০ শতাংশের বেশি অবদান রাখবে আফ্রিকা মহাদেশ, যা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে।
উন্নত বিশ্বের সংকট ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ :
অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের অর্থনীতিতে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে জন্ম (প্রায় ৩৬.৬ লাখ) ও মৃত্যুর (প্রায় ৩০.৯ লাখ) ব্যবধান অত্যন্ত সংকির্ণ—মাত্র ৫ লাখ ৭০ হাজার। মূলত অভিবাসনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র জনসংখ্যা বজায় রাখতে পারলেও ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশ (যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালি) ইতিমধ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি।
জনসংখ্যা বিশ্লেষকদের মতে, জন্মহার কমে যাওয়া এবং গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উন্নত বিশ্বের পেনশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যখাত এবং কর্মক্ষম শ্রমবাজারে মারাত্মক সংকট তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত তরুণ কর্মীর অভাবে আগামী দিনে এশিয়ার পরাশক্তি চীনসহ উন্নত বিশ্বের আরও একাধিক দেশ অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।