
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনার ধাক্কা এসে পড়েছে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতারসহ প্রধান উৎসগুলো থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডের এই চরম বিপর্যয় ও বিদ্যুতের অনিয়ম সামাল দিতে বাসা-বাড়ি থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্পকারখানা এখন দ্রুত সোলার (সৌরবিদ্যুৎ) ও ব্যাটারি প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। রাজধানী ঢাকার কাপ্তান বাজার এখন দেশের এই ঐতিহাসিক জ্বালানি পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ঢাকার কাপ্তান বাজার দীর্ঘদিন ধরেই ইলেকট্রনিক্স ও সোলার যন্ত্রাংশের অন্যতম প্রধান পাইকারি ও খুচরা হাব হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের সরু গলির ছোট ছোট দোকানগুলোতে সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির পশরা এবং ক্রেতাদের ভিড় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। পাইকারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডংজিন গ্রুপ বাংলাদেশের বিক্রয় প্রতিনিধি মঞ্জু হোসেন জানান, দেশের লোডশেডিং পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেওয়ায় তাদের সরঞ্জামের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্ল্যাকআউট বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে শিল্পগ্রাহকদের কাছ থেকে চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কারণ কারখানা চালু রাখতে তাদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন।’ গত বছরের তুলনায় তাদের প্রতিষ্ঠানের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের মূল এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার থেকে জ্বালানি আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বহু এলাকায় দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রিডের বিদ্যুৎ সচল রাখতে বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে তিনগুণ বেশি দামে এলএনজি কিনছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের খরচ লাফিয়ে বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলে। একদিকে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিল—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে গ্রাহকরা বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন। এমনকি সম্প্রতি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবনেও সৌর প্যানেল বসানোর তথ্য মিলেছে।
বাংলাদেশ মূলত চীনের সোলার প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে চীন থেকে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি আমদানির মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। বাজারে তুলনামূলক কম দাম ও দীর্ঘ স্থায়িত্বের জন্য চীনা কোম্পানি জিনকো সোলার এবং লংগি গ্রিন এনার্জির প্যানেল সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। একটি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় ৭৫০ ওয়াটের সোলার প্যানেলের দাম পড়ে প্রায় ১৫ হাজার টাকা অথচ ওই পরিবারের বার্ষিক বিদ্যুৎ বিল আসে গড়ে ৩৮ হাজার টাকা। সোলার প্যানেলের সঙ্গে ব্যাটারি ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যোগ করলে প্রাথমিক খরচ কিছুটা বাড়ে, কিন্তু ব্যবসায়ীদের মতে ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যেই সেই মূল বিনিয়োগ পুরোটাই উঠে আসে।
আবাসিক খাতের পাশাপাশি পোশাক, টেক্সটাইল ও সিরামিক শিল্প মালিকরাও কারখানা চালু রাখতে সোলার প্যানেল বসাচ্ছেন। এক্সেলেন্ট সিরামিকস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হাকিম বলেন, ‘সৌরবিদ্যুতের চাহিদা এখন ব্যাপক। ব্যাটারির ব্যাকআপ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশী গ্রাহকদের পরবর্তী ধাপ হচ্ছে লিথিয়াম ব্যাটারি।’ তবে তিনি এটিও মনে করিয়ে দেন যে, তার কারখানার পণ্য পোড়ানোর মূল ক্লিন বা চুল্লিগুলো গ্যাসে চলে, যা কেবল সোলার দিয়ে চালানো সম্ভব নয়।
একই সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা। দেশে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড এইচ অ্যান্ড এম এবং রালফ লরেন-এর সরবরাহকারী টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে বিদ্যুতের পাশাপাশি বিশাল পরিমাণ বাষ্প (স্টিম) প্রয়োজন হয়। দেশের অন্যতম শীর্ষ পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মশরাফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ কেবল বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি শিল্প বয়লারের জন্য প্রয়োজনীয় বাষ্প তৈরি করতে পারে না।’ ফলে জমি ও প্রযুক্তিগত সীমার কারণে টেক্সটাইল ও ডাইং মিলগুলোর বিশাল জ্বালানি চাহিদার পুরোপুরি বিকল্প সৌরবিদ্যুৎ হতে পারছে না।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে সরকার সোলার প্যানেল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। সরকারের নীতিগত লক্ষ্য হলো—২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে অর্জন করা, যা গত বছর ছিল মাত্র ২.৫ শতাংশ। তবে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস (আইইইএফএ)-এর বাংলাদেশ বিশ্লেষক শফিকুল আলম সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও একটি বড় সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমদানি শুল্ক কমানো একটি সহায়ক পদক্ষেপ হলেও এটি প্রধানত উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বেশি উপকারী যারা এককালীন বিপুল অর্থ খরচ করে পুরো সিস্টেম কিনতে পারে। কিন্তু নিম্ন-আয়ের জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভারত সরকারের মতো সরাসরি ভর্তুকি মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে।’
শুধু বাংলাদেশ নয়; পাকিস্তান, ফিলিপাইন কিংবা নাইজেরিয়ার মতো উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যেভাবে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম অস্থিতিশীল করে তুলেছে, তাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো দ্রুত বিকল্প হিসেবে সোলার ও লিথিয়াম ব্যাটারির দিকে মোড় নিচ্ছে। বাংলাদেশের কাপ্তান বাজারের ব্যস্ততা প্রমাণ করে—আন্তর্জাতিক জ্বালানি শকের মুখে পড়ে হলেও টেকসই ও সৌরশক্তির যুগের দিকে দেশের যাত্রা এখন আর থেমে নেই, বরং তা অভাবনীয় গতি পেয়েছে।
সূত্র: ব্লুমবার্গ গ্রিন, দ্য জাপান টাইমস।