ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

মিয়ানমারে নারী বন্দীদের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ সকাল

Link Copied!

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে কারাবন্দী নারী রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং জীবনঘাতী চিকিৎসা অবহেলা অব্যাহত রেখেছে দেশটির সামরিক জুন্টা। সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বন্দীশালায় নারীদের ওপর নির্যাতন ও অবহেলার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং নিয়মিত ব্যবস্থার অংশ।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে এ পর্যন্ত ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ জন নারী এবং ৬৪০ জন শিশু রয়েছে। মুক্তিপ্রাপ্ত সাবেক বন্দী ও তাদের পরিবার জানিয়েছে, কারাবন্দী অবস্থায় নারীদের ওপর বেধড়ক মারধর, ধর্ষণ, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হচ্ছে। এমনকি গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে প্রসবপূর্ব ও প্রসূতি চিকিৎসায় বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী অবহেলা করা হচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ১৭ জন সাবেক নারী রাজনৈতিক বন্দী, তিন জন পরিবারের সদস্য এবং চার জন আইনজীবী ও অধিকারকর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। গ্রেপ্তার হওয়ার সময় এই নারীরা মূলত আন্দোলনকর্মী, সাংবাদিক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং ত্রাণকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তাদের দেশের ১১টি বিভিন্ন জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র (ইন্টারোগেশন সেন্টার) ও কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক ব্রায়নি লাউ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মিয়ানমারে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে আটক নারীরা অত্যন্ত অস্বস্তিকর কারাগার ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে কষ্ট ও অবহেলা উভয়ই ইচ্ছাকৃত এবং নিয়মিত। স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে নির্যাতন এবং মুক্তির পরও তাড়া করে বেড়ানো ট্রমার মধ্য দিয়ে নারীরা প্রতি মুহূর্তে অবিচারের শিকার হচ্ছেন।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক জান্তার সমালোচক বা বিরোধীদের দমনে তৈরি বিভিন্ন কঠোর আইনে এসব নারীদের সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেনাল কোডের ৫০৫(এ) ধারা এবং অত্যন্ত কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন। বেশ কয়েকজন নারী জানিয়েছেন, তাদের আত্মীয় বা বন্ধুরা প্রশাসনের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তাদের ‘মানব ঢাল’ বা জিম্মি হিসেবে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়েছিল।

জিজ্ঞাসাবাদের সময়—যা কখনো কখনো মাসব্যাপী স্থায়ী হতো—নারীদের ওপর পাইকারি হারে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। লাঠি, শিকল, ধাতব পাইপ এবং গুলতি দিয়ে পেটানো ছাড়াও তাদের বৈদ্যুতিক শক, যৌন সহিংসতা, সিগারেটের ছ্যাকা দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় স্ট্রেস পজিশনে বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে।

বেশিরভাগ নারী জানিয়েছেন যে তারা যৌন হয়রানি বা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। নিরাপত্তার কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই অত্যন্ত অপমানজনক ও আক্রমণাত্মক উপায়ে বারবার তাদের শরীর তল্লাশি করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ বছর বয়সী এক গর্ভবতী আন্দোলনকারীকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার স্বামী জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় জান্তার লোকজন গর্ভস্থ সন্তানের কথা বলে তাকে হুমকি দিত এবং বলত, ‘যদি তথ্য না দাও, তবে তোমার পেটে আঘাত করব।’

রাজনৈতিক বন্দীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পোলিসিন্যাল প্রিজনার্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত হেফাজতে মৃত্যুর শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি পুরুষ ও নারী। এছাড়া ‘মিয়ানমার প্রিজন উইটনেস’ নথিভুক্ত করেছে যে, ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৯০ জন রাজনৈতিক বন্দীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৪৩ জনই নারী রাজনৈতিক বন্দী ও তাদের শিশু সন্তান।

এদিকে কারাগারে গুরুতর অসুস্থতা ও জরুরি চিকিৎসা সেবা পেতে কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়তে হয়। চিকিৎসাসেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল; এর জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, কারারক্ষীদের ঘুষ দিতে হয় এবং বাইরে থেকে টাকা পাঠিয়ে নিজেদের ওষুধ জোগাড় করতে হয়।

বিশেষ করে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার প্রায় পুরোটাই অনুপস্থিত। গর্ভবতী নারীদের প্রয়োজনীয় প্রসবপূর্ব, প্রসূতি ও প্রসবোত্তর চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসার অভাবে নারীরা সেল বা প্রকোষ্ঠের মধ্যেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন, যা মৃতপ্রসব এবং মা ও শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২০২১ সালে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেপ্তার হওয়া এক নারী জানান, জিজ্ঞাসাকারীরা তার গর্ভাবস্থার কথা জেনেই তাকে বৈদ্যুতিক শক দেয় এবং মারধর করে। পরে তাকে ব্যবহৃত মেডিকেল মাস্ক ও গাউনের স্তূপের মাঝে কংক্রিটের মেঝেই অন্য ৯ জন গর্ভবতী বন্দীর সঙ্গে একটি স্টোররুমে গাদাগাদি করে রাখা হয়। প্রসববেদন ওঠার পর হাসপাতালে রেফার করার কাগজ পেতে অনেক দেরি হওয়ায় এবং ডেলিভারির পরপরই তার পায়ে আবার শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়।

কারাগারের সেলগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, পচা ও পোকা ধরা খাবার, দূষিত পানির কারণে ডায়েরিয়া, চর্মরোগ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং যোনিপথে সংক্রমণ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নারীরা মারাত্মক মানসিক অবসাদ, অনিদ্রা, প্যানিক অ্যাটাক এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। ইউনিফর্ম পরা মানুষ দেখলেই তাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক কাজ করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবিলম্বে নারী রাজনৈতিক বন্দী এবং দেশটির দীর্ঘকাল ধরে আটক সাবেক নেতা অং সান সু চিসহ সব বন্দীকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে, জান্তা কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাদের কারাগারে পূর্ণ প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

সূত্র : হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

বিশ্ব ফুসফুস দিবস কাল: তামাক ও নিকোটিনমুক্ত হোক তরুণ প্রজন্মের ফুসফুস

বাঁশখালীতে বন্যার্তদের ঘর নির্মাণে দেওয়া হবে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা

প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত: শ্রমমন্ত্রী

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: ইরানের কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল

আফতাবনগর-বনশ্রীতে যানজট কমাতে ৩ ব্রিজ নির্মাণ

আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ

চাহিদা মেটাতে ১০ হাজার টন মসুর ডাল ও ১.৫৫ লাখ টন সার কিনবে সরকার

মিয়ানমারে নারী বন্দীদের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে

মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে ৪ শতাংশ: এডিবি

কুষ্ঠ-যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের ঝুঁকিভাতা পুনর্নির্ধারণ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়ল বাসভাড়া, নতুন হার কার্যকর