
প্লাস্টিকের ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যে নতুন রাসায়নিক ব্যবহার করছে, সেটিও গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের এক গবেষণায় প্লাস্টিক নরম ও নমনীয় করতে ব্যবহৃত ‘ডিআইএনসিএইচ’ (DINCH) নামের একটি রাসায়নিকের সংস্পর্শের সঙ্গে নবজাতকের কম ওজন এবং গর্ভকাল অনুযায়ী ছোট আকারে জন্ম নেওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
৬ হাজার ৬০০-এর বেশি গর্ভাবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশের প্রস্রাবে এই রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় ডিআইএনসিএইচের সংস্পর্শ ১০ গুণ বাড়লে নবজাতকের জন্মের ওজন গড়ে ২৭ গ্রাম কম হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ৭ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরেছে।
কী এই ডিআইএনসিএইচ রাসায়নিক?
ডিআইএনসিএইচের পূর্ণ রাসায়নিক নাম 1,2-cyclohexane dicarboxylic acid diisononyl ester। প্লাস্টিককে আরও নমনীয় ও টেকসই করতে এটি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে খাবারের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত নরম প্লাস্টিক, ক্লিং ফিল্ম বা খাবার ঢেকে রাখার প্লাস্টিক, প্লাস্টিকের ওয়াইন কর্ক, শিশুদের খেলনা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কিছু কাপড় ও মেঝের উপকরণে এই রাসায়নিক পাওয়া যায়।
আগে প্লাস্টিক তৈরিতে ফথালেটস (Phthalates) নামের একধরনের রাসায়নিক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এসব রাসায়নিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এরপর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ফথালেটসের বিকল্প হিসেবে ডিআইএনসিএইচের ব্যবহার বাড়াতে শুরু করে। এটিকে তুলনামূলক নিরাপদ ও বিষমুক্ত বিকল্প হিসেবে বাজারজাত করা হয়েছিল।
৬ হাজার ৬০০-এর বেশি গর্ভাবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ
গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) ‘এনভায়রনমেন্টাল ইনফ্লুয়েন্সেস অন চাইল্ড হেলথ আউটকামস’ (ECHO) কর্মসূচির আওতায় সংগৃহীত ৬ হাজার ৬০০-এর বেশি গর্ভাবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
এতে দেখা যায়, নারীদের প্রস্রাবে ডিআইএনসিএইচের উপস্থিতি যত বেশি, তাঁদের সন্তানদের গর্ভকাল অনুযায়ী কম ওজন নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকিও তত বেশি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে ‘স্মল ফর জেস্টেশনাল এজ’ (Small for Gestational Age) বলা হয়। অর্থাৎ, একই গর্ভকাল শেষে জন্ম নেওয়া অন্যান্য শিশুর তুলনায় শিশুটির আকার ও ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। সাধারণত গর্ভকাল অনুযায়ী ওজন দশম পার্সেন্টাইলের নিচে থাকলে এ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষণায় হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মা এবং তুলনামূলক কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের সন্তানদের মধ্যে এ ধরনের প্রভাব বেশি দেখা গেছে।
শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ
গবেষণার লেখকদের মতে, গর্ভে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হলে পরবর্তী জীবনে হৃদ্রোগ, শেখার ক্ষেত্রে অসুবিধা ও স্থূলতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব প্রভাব শৈশব পেরিয়ে কৈশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও থাকতে পারে।
এর আগে প্রাণী ও মানবকোষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় ডিআইএনসিএইচের উপজাত রাসায়নিকগুলো শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দিতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় শিশুর বিকাশ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে গর্ভের শিশুর কাছে পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও ব্যাহত করতে পারে বলে গবেষকেরা ধারণা করছেন।
তবে এসব সম্ভাব্য জৈবিক প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। নতুন গবেষণাটি ডিআইএনসিএইচের সংস্পর্শের সঙ্গে কম জন্ম ওজনের সম্পর্ক দেখিয়েছে; এটি সরাসরি প্রমাণ করে না যে রাসায়নিকটিই শিশুর ওজন কমার কারণ।
বিকল্প রাসায়নিক ব্যবহারে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি
গবেষণাটিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর রাসায়নিক প্রতিস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাও সামনে এসেছে। কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিবর্তে নতুন রাসায়নিক ব্যবহার শুরু হলেও সেটি যে নিরাপদ, তার নিশ্চয়তা নেই। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক আলোচনায় এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘রিগ্রেটেবল সাবস্টিটিউশন’ (Regrettable Substitution) বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফথালেটসের ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগের পর ডিআইএনসিএইচের উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। ২০০২ সালে বিশ্বব্যাপী এর উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ টনে। জার্মান রাসায়নিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএএসএফও এই রাসায়নিকের অন্যতম বড় উৎপাদক।
এদিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ফুড প্যাকেজিং ফোরামের গবেষকেরাও ডিআইএনসিএইচের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, খাবারের প্যাকেজিং থেকে এই রাসায়নিক খাবারের মধ্যে মিশে যাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। ইউরোপের মানুষের শরীরেও কয়েক দশকে এর উপস্থিতি বেড়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটি বর্তমানে রাসায়নিকটির স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে।
রাসায়নিক ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা যাচাইয়ের আহ্বান
গবেষণাটির অন্যতম প্রধান লেখক লিওনার্দো ট্রাসান্দে বলেছেন, সাধারণ মানুষের ব্যাপক সংস্পর্শে আসার আগেই রাসায়নিকের নিরাপত্তা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, খাবারের প্যাকেজিং ও গৃহস্থালি পণ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক বাজারে ছাড়ার আগেই সেগুলোর স্বাস্থ্যগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। ক্ষতিকর প্রভাব শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে শুরু থেকেই শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আলোচনাধীন বৈশ্বিক প্লাস্টিক চুক্তিকেও কার্যকর নীতিমালা তৈরির একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা।
গর্ভবতী নারী ও শিশুদের রাসায়নিকের সংস্পর্শ কমাতে যতটা সম্ভব প্লাস্টিকমুক্ত পণ্য ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা। খাবার সংরক্ষণে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচের পাত্র এবং রান্নাঘরের সরঞ্জামে কাচ বা কাঠের সামগ্রী ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।
গবেষণাটি প্লাস্টিকের বিকল্প রাসায়নিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যাচাইয়ের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রাসায়নিককে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ৭ নভেম্বর ২০২৬; নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের গবেষণা।