
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যার প্রভাবে ভেঙে পড়েছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি দুটি বিখ্যাত পাথুরে স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে নিউ মেক্সিকোর পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘এলিয়েন থ্রোন’ (Alien Throne) এবং ‘কিং অব উইংস’ (King of Wings)। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে স্থাপনা দুটির ধসে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী, পর্যটক ও আলোকচিত্রীদের মধ্যে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রবল বৃষ্টিপাত ও বন্যা এ ক্ষতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ৬ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল এলিয়েন থ্রোন
নিউ মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আহ-শি-স্লে-পাহ (Ah-Shi-Sle-Pah) ওয়াইল্ডারনেস এলাকার কাছে ভ্যালি অব ড্রিমস ট্রেইলে অবস্থিত ছিল এলিয়েন থ্রোন। অদ্ভুত আকৃতির উঁচু পাথুরে স্তম্ভটির কারণে এলাকাটি পর্যটক ও আলোকচিত্রীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় ছিল।
গত ৩০ অক্টোবর নাভাজো ট্যুরস ইউএসএর প্রতিষ্ঠাতা ও পর্যটন গাইড কিয়ালো উইন্টার্স পর্যটকদের নিয়ে ওই এলাকায় যাওয়ার সময় স্থাপনাটির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তিনি জানান, একটি বাঁক ঘুরতেই চোখে পড়ে পাথুরে স্তম্ভটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে।

এলিয়েন থ্রোন দেখতে প্রতিবছর বহু পর্যটক ওই এলাকায় যেতেন। উইন্টার্সের ভাষায়, এটি ছিল পর্যটকদের ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
গত ১৩ বছর ধরে ওই অঞ্চলে পর্যটকদের পথ দেখাচ্ছেন উইন্টার্স। তাঁর মতে, স্থাপনাগুলো শুধু পর্যটন আকর্ষণ নয়, স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ধসে পড়ে কিং অব উইংসও
শুধু এলিয়েন থ্রোন নয়, কাছাকাছি অবস্থিত আরেকটি বিখ্যাত পাথুরে স্থাপনা কিং অব উইংসও ধসে পড়েছে। উইন্টার্স এটিকে ‘হুডু’ বা প্রাকৃতিক পাথুরে স্তম্ভগুলোর মধ্যে অত্যন্ত বিরল একটি নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হাইকিংবিষয়ক ওয়েবসাইট অলট্রেইলসের (AllTrails) ব্যবহারকারীদের একাধিক পোস্ট থেকে ধারণা করা হচ্ছে, গত ৯ অক্টোবরের আগেই স্থাপনাটি ভেঙে পড়েছিল। অর্থাৎ, কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই অঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।
অতিবৃষ্টি ও বন্যায় বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ধারাবাহিক ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিয়েছে। নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো, উটাহ ও অ্যারিজোনার বিভিন্ন এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। প্লাবিত হয়েছে সাধারণত শুষ্ক থাকা নদীখাত ও নিম্নাঞ্চল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর ও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা।
নিউ মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বন্যার কারণে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। শত শত মানুষকে পানিবন্দি অবস্থা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিকটবর্তী শহর ফার্মিংটনে কয়েকটি পরিবার বন্যার পানিতে বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় ছাদে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। পরে উদ্ধারকারীরা তাঁদের উদ্ধার করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর দিকে ফোর কর্নারস অঞ্চল ও নেভাদাজুড়ে ২০ ট্রিলিয়ন গ্যালনের বেশি বৃষ্টির পানি জমেছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। এর আগে শরৎকালেও অঞ্চলটিতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। ফলে মাটি আগে থেকেই পানিতে সম্পৃক্ত থাকায় নতুন বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিক্ষয়ের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
আদিবাসীদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ ছিল স্থাপনাগুলো
এলিয়েন থ্রোন ও কিং অব উইংস স্থানীয় নাভাজো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন ছিল না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এসব পাথুরে স্থাপনাকে পথচিহ্ন বা দিকনির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথ ও বিভিন্ন প্রজন্মের মুখে মুখে প্রচলিত গল্পের সঙ্গেও এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
উইন্টার্স বলেন, স্থাপনাগুলো আদিবাসীদের পরিচয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো হারিয়ে যাওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ক্ষতি।
তবে তিনি মনে করেন, প্রকৃতির নিয়মেই ভূমির পরিবর্তন ঘটে। যে ক্ষয়প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব পাথুরে স্থাপনা তৈরি হয়েছে, একই প্রক্রিয়ায় একসময় সেগুলো ধ্বংসও হতে পারে।
ধসের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের উদ্যোগ
এলিয়েন থ্রোন ঠিক কী কারণে ধসে পড়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভারী বৃষ্টিপাত ও এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট আবহাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করা হলেও বিষয়টি নিশ্চিত করতে নাভাজো নেশন কর্তৃপক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ল্যান্ড ম্যানেজমেন্টের (Bureau of Land Management) তদন্ত করার কথা রয়েছে।
এদিকে ফোর কর্নারস অঞ্চলের অন্যান্য পাথুরে স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। উটাহ, কলোরাডো, অ্যারিজোনা ও নিউ মেক্সিকোর বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক প্রাকৃতিক পাথুরে স্তম্ভ রয়েছে। তবে চিরিকাহুয়া, গবলিন ভ্যালি, গোল্ড বাট ও ক্যাথেড্রাল গর্জ এলাকার পার্ক কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নথিভুক্ত করেনি।
এর আগে অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের কয়েক শতাব্দী পুরোনো হোলেই সি আর্চও প্রশান্ত মহাসাগরে ধসে পড়ে।
পর্যটকদের প্রতি সতর্কবার্তা
ধসে পড়া স্থাপনাগুলোর অবশিষ্ট অংশে ওঠা বা সেখান থেকে পাথরের টুকরো সংগ্রহ না করতে পর্যটকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন উইন্টার্স। তাঁর মতে, এসব স্থানের প্রতি সম্মান দেখানো স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানোরই অংশ।
তিনি বলেন, ছবি, গল্প ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া স্থাপনাগুলোর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এসব নিদর্শন আর আগের অবস্থায় না থাকলেও মানুষের ইতিহাস ও স্মৃতিতে সেগুলোর গুরুত্ব থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান