ঢাকারবিবার , ৮ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. নিরাপদ খাদ্য

জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় এবার সংকটে কলা!

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
৮ নভেম্বর ২০২৬, ২:২০ বিকাল

Link Copied!

জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার প্রভাবে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কলার উৎপাদন মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও প্রবল বাতাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কলার বাগান। এর সঙ্গে বাড়ছে সার, জ্বালানি ও শ্রমিকের খরচ। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ধরে রাখা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কলার ন্যায্য দাম ও নিয়মিত অর্থ পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন লাতিন আমেরিকার উৎপাদকরা।

বিশেষ করে চলতি বছরের সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উৎপাদকদের আশঙ্কা, চরম আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন আরও কমতে পারে। এতে কৃষক ও শ্রমিকদের আয় কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কলার সরবরাহও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান রোববার (৮ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।

এল নিনোর প্রভাবে কমছে উৎপাদন

লাতিন আমেরিকার কলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে কলম্বিয়া, পেরু ও ইকুয়েডরে ইতোমধ্যে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কলম্বিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে প্রবল বাতাস এবং পেরু ও ইকুয়েডরে অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা ও শুষ্ক আবহাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফেয়ারট্রেড ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, আগের এল নিনো চক্রে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে কলার উৎপাদনশীলতা ১৩ শতাংশ, ইকুয়েডরে ২২ শতাংশ এবং পেরুতে ৬ শতাংশ কমেছিল। ১৯৮৩ সালের শক্তিশালী এল নিনোতে ইকুয়েডরের মোট কলা আবাদি জমির ১৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই সময়ে দেশটির কলা রপ্তানি কমেছিল ৩৬ শতাংশ।

ফেয়ারট্রেডের জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক প্রধান ড. কার্লি-জেন স্ট্যানটন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এবারের এল নিনোতে অতিবৃষ্টি ও প্রবল বাতাসসহ চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। ফলে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো চক্রের তুলনায় এবার উৎপাদকদের ক্ষতি আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কলম্বিয়ার কলা রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

জলবায়ুজনিত ক্ষতির প্রভাব ইতোমধ্যে কলম্বিয়ার কলা রপ্তানিতে দেখা যাচ্ছে। দেশটির ম্যাগদালেনা ও লা গুয়াহিরা অঞ্চলের কলা উৎপাদকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে কলা রপ্তানির আয় ৩২ শতাংশ কমে ১২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কলার চালান ৪২ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে রপ্তানি আয় ৭ কোটি ডলার থেকে কমে ৪ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

উৎপাদকদের সংগঠনটি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, রপ্তানি আয় হ্রাস এবং মুদ্রাবাজারের প্রতিকূল পরিস্থিতি কলা শিল্পের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য বাণিজ্যিক মূল্য নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়ছে না কলার দাম

কলার উৎপাদন দিন দিন ব্যয়বহুল হয়ে উঠলেও সুপারমার্কেটগুলোতে প্রায় ৪০ বছর ধরে কলার দাম মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। অথচ এ সময়ে সার, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদনের প্রায় সব খরচ বেড়েছে।

বড় কলা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফাইফসের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান কাওইমে বাকলি বলেন, কলা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের সঙ্গে ক্রয়প্রক্রিয়ার ন্যায্যতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ব্যয়ও কলার দামে বিবেচনা করা উচিত।

এদিকে এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে কলা সরবরাহকারীদের ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ যে দাম পেয়েছেন, তা দিয়ে তাঁদের উৎপাদনের মৌলিক খরচও মেটেনি।

ন্যায্য মজুরি না পেলে ঝুঁকিতে শ্রমিকের জীবন-জীবিকা

কলার উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। কলম্বিয়ার আগ্রোসিয়েতে কলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক এভার আন্তোনিও ফ্লোরেস মুনোস ফেয়ারট্রেডকে জানিয়েছেন, গত ১০ বছরে তাঁদের এলাকায় আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তাপমাত্রা বেড়েছে, কোথাও বন্যা হয়েছে, কোথাও প্রবল বাতাসে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তাঁর আশঙ্কা, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের প্রভাব শ্রমিকদের ওপরও পড়বে। উৎপাদন কমলে তাঁদের মজুরি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ফেয়ারট্রেড যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে নতুন আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, কৃষকদের কম দাম দেওয়া, পাওনা পরিশোধে বিলম্ব করা এবং এমন চুক্তি করা বন্ধ করতে হবে, যার মাধ্যমে ব্যবসায়িক ঝুঁকি বড় ক্রেতারা উৎপাদকদের ওপর চাপিয়ে দেয়।

ফেয়ারট্রেডের মতে, ন্যায্য দাম ও নিয়মিত অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত হলে কৃষকেরা সেচব্যবস্থা উন্নত করা, রোগবালাই প্রতিরোধ এবং প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলায় বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।

২০৫০ সালের মধ্যে কমতে পারে কলা চাষের উপযোগী জমি

জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আন্তঃআমেরিকান উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) জন্য ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে কলা চাষের উপযোগী জমির পরিমাণ গড়ে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কলার রোগবালাই ও পোকামাকড়ের বিস্তারও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উৎপাদন ধরে রাখতে কৃষকদের বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে।

ফেয়ারট্রেডের প্রধান নির্বাহী এলিনর হ্যারিসন বলেন, যুক্তরাজ্যের কলার সরবরাহ নির্ভর করছে যাঁরা কলা উৎপাদন করেন, তাঁদের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। এজন্য উৎপাদকদের ন্যায্য দাম, জলবায়ু সহনশীলতা এবং শ্রমিকদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Sainsbury’s (সেইনসবারিজ) কো-অপ ও ওয়েটরোজের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় ফেয়ারট্রেডের আওতায় উৎপাদিত কলা সংগ্রহ করছে। এতে উৎপাদকদের জন্য ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিত হয়। তবে ফেয়ারট্রেড মনে করছে, পুরো শিল্পে ন্যায্য বাণিজ্যিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু কলার উৎপাদন নয়, এর সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ কৃষক ও শ্রমিকের জীবিকাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে কলা শিল্পের স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক সরবরাহ-দুটিই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ৮ নভেম্বর ২০২৬; ফেয়ারট্রেড ফাউন্ডেশন; এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ; আন্তঃআমেরিকান উন্নয়ন ব্যাংক।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

গত ৯ মাসে ৭০ দুর্ঘটনায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রাণ গেল ৭৬ জনের

বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় পঞ্চম ঢাকা, বাতাস কতটা বিপজ্জনক?

তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ১৬.৫ ডিগ্রি, জেঁকে বসছে শীত

শীতের আগেই বৃষ্টিতে ডুবছে গাজা, চরম বিপাকে লাখো ফিলিস্তিনি

দুই মাসে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ল ৭.৫২%, সবচেয়ে বেশি বাড়ল যে পণ্যের

30th U.S. Trade Show 2026 Inaugurated in Dhaka to Strengthen Bangladesh-U.S. Trade Ties

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে ঢাকায় শুরু হলো ৩০তম ইউএস ট্রেড শো ২০২৬

কপ৩১-এর আগে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের ঐক্যের ডাক

এশিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রকৃতির মূল্য সংযোজনের উদ্যোগ জাতিসংঘের

ত্রাণ কমেছে, বেড়েছে ভয় : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারী ও শিশুদের বোবা কান্না

গাজায় ৭ কোটি টন ধ্বংসাবশেষ: পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা

বিশ্বে জনমিতিতে বড় পরিবর্তন: জন্ম-মৃত্যুর ব্যবধানে শীর্ষে যে দেশগুলো