ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. নিরাপদ খাদ্য

সাতক্ষীরায় ৭৫ শতাংশ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ সকাল

Link Copied!

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ পরিবার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এসব পরিবারের ৫২ দশমিক ২ শতাংশকে কখনো কখনো সারা দিন না খেয়ে থাকতে হয়। আর ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারে বড়রা কম খেয়ে শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। এমনকি ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের ঘরে কোনো খাবার মজুত নেই অথবা সর্বোচ্চ তিন দিনের খাবার রয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রকাশিত ‘বাস্তুচ্যুত, বঞ্চিত’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি বাংলাদেশ ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান) যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ সামনে রেখে জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য অধিকার নিয়ে এ গবেষণা করা হয়েছে।

রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘কপ৩১ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জলবায়ু ন্যায়বিচার’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। খানি বাংলাদেশের সহসভাপতি রেজাউল করিম সিদ্দিকের সভাপতিত্বে মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রানের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর উম্মে সালমা পপি।

গবেষণা অনুযায়ী, সাতক্ষীরা পৌরসভার ৪৭টি অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আনুমানিক ৭ হাজার ৫৭৩টি জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে ৩৫টি বসতির ৩৫৮টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার তীব্র এবং ২৩ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার মাঝারি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। জরিপে খাদ্যনিরাপদ কোনো পরিবার পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার অন্তত আংশিকভাবে লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল। সরকারি জমিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ৫৯ শতাংশ উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকির মুখে রয়েছে। অথচ মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। সহায়তা না পেলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়, তা জানেন না ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার।

সংবাদ সম্মেলনে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন সাতক্ষীরায় আত্মপ্রকাশ করা ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ফোরাম’-এর আহ্বায়ক ফাতেমা খাতুন। তিনি বলেন, দুর্যোগের পর তাঁরা প্রথমে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেন। পরে সাতক্ষীরা শহরে এসে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছেন। কিন্তু সেখানে নেই ডাস্টবিন, কাজের সুযোগ, পর্যাপ্ত পানি কিংবা ঘরবাড়ির নিশ্চয়তা। কাজের অভাবে পুরুষেরা আয় করতে পারছেন না। ফলে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্বদেশ, সাতক্ষীরার নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, এসব মানুষ যেন ‘নেই রাজ্যের বাসিন্দা’। এখনো তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা নেই, কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ নেই।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক, সাংবাদিক ও গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, ১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে সাতক্ষীরায় বাস্তুচ্যুত মানুষ আসতে শুরু করেন। অথচ সরকারি দপ্তরে তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা নেই। রাষ্ট্র বিষয়টি যথাযথভাবে আমলে না নেওয়ায় তাঁরা বারবার দুর্যোগের শিকার হচ্ছেন। এভাবে বাস্তুচ্যুতি ও দুর্ভোগের একটি চক্র তৈরি হয়েছে।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক অমিত রঞ্জন দে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী, তাঁদের কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হচ্ছেন এসব অসহায় মানুষ। আইলার শিকার মানুষেরা এখনো মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আসন্ন কপ৩১ সম্মেলনে তাঁদের অধিকার ও দুর্দশার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও পিপিআরসির জ্যেষ্ঠ ফেলো মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ বলেন, সরকারি দপ্তরগুলো সাধারণত দুর্যোগের আগে নয়, বরং দুর্যোগের পরে কাজ করে। জলবায়ু-বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং ডিজাস্টার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, উজানে পদ্মা থেকে রাজশাহী ও ঢাকার জন্য কত পানি তুলে নেওয়া হচ্ছে, তার সঠিক হিসাব নেই। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বস্তিবাসীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আগামী পৌরসভা নির্বাচনে তাঁদের জন্য আলাদা আসন রাখার প্রস্তাবও দেন তিনি। তাঁর মতে, ক্ষমতার অংশীদার হতে না পারলে এসব মানুষের কথা কেউ শুনবে না।

বক্তারা বলেন, আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ৩১ সম্মেলনের মূলমন্ত্র ‘সংলাপ থেকে ঐকমত্য, ঐকমত্য থেকে কর্ম’ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার অন্যতম মাপকাঠি হওয়া উচিত জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি। সভাপতির বক্তব্যে রেজাউল করিম সিদ্দিক বলেন, জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যাঁরা অংশ নেবেন, তাঁদের তৃণমূলের মানুষের এসব সমস্যা ও দাবির কথা তুলে ধরতে হবে।

প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ

জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক সুপারিশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান দুটি। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি খাসজমিতে বাস্তুচ্যুত পরিবারের স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসন ছাড়া কোনো পরিবারকে উচ্ছেদ না করা।

এ ছাড়া জরুরি খাদ্য সহায়তা, ন্যায্যমূল্যে খাদ্য কর্মসূচি, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় অন্তর্ভুক্তি এবং শিশু ও মায়েদের পুষ্টিসেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিটি বসতিতে নিরাপদ খাবার পানি, পানির মান পরীক্ষা, স্যানিটেশন ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।

বাস্তুচ্যুত নারী-পুরুষ ও তরুণদের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বর্তমান ঠিকানায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নিবন্ধনের জন্য ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্প চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা, কাগজপত্রের অভাবে শিশুদের শিক্ষাবঞ্চিত না করা এবং শিশুশ্রম রোধে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

গবেষণায় জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১ বাস্তবায়নে জেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর নিয়মিত অংশগ্রহণমূলক তথ্য সংগ্রহ এবং সমন্বিত খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

কপ৩১-এ বাংলাদেশের জন্য সুপারিশ

আসন্ন কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান থেকে কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষয়ক্ষতি ও বিনষ্টি তহবিলে বাংলাদেশের প্রস্তাবে অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিসহ জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১ বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

এ ছাড়া বৈশ্বিক অভিযোজন লক্ষ্যের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার তথ্য আলাদাভাবে তুলে ধরা এবং অভিযোজন অর্থায়নে শহরের অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারী জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে অনুদানভিত্তিক ও বহুবছরমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের নিয়মিত পুনঃপূরণের দাবি তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৬ মৃত্যু

ভিভো ভি৮০: নতুন রং ও নতুন ডিজাইনে আসছে নতুন চমক

vivo V80: Arriving in a New Colour with a New Design

ক্রোনস ও আলসারেটিভ কোলাইটিস: দুই রোগের পার্থক্য, লক্ষণ ও চিকিৎসা

জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের হাতে দুই দশক: বিশ্বব্যাংক

Xiaomi Unveils REDMI 17 5G Featuring a Snapdragon 5G Processor

স্ন্যাপড্রাগন ফাইভজি প্রসেসরসহ রেডমি ১৭ ফাইভজি উন্মোচন করল শাওমি

আগামী গ্রীষ্মের আগে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে: প্রধানমন্ত্রী

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে সব প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান