ঢাকারবিবার , ৮ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১০ বছর, উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে কতটা সফল বিশ্ব?

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪০ বিকাল

Link Copied!

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১০ বছর পূর্ণ হলেও বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে এর মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। চুক্তিতে বিশ্বের তাপমাত্রা প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু টানা দুই বছর বৈশ্বিক তাপমাত্রা এই সীমা ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতেও চলতি পথে শতাব্দীজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বা কপ (COP) এবং প্যারিস চুক্তির কার্যকারিতা কতটা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা থাকলেও বৈশ্বিক জলবায়ু উদ্যোগের জন্য প্যারিস চুক্তি এখনো গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০১৬ সালে কার্যকর হওয়া প্যারিস চুক্তির মূল ভিত্তি হলো-প্রতিটি দেশ নিজস্বভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু চুক্তির ১০ বছর পরও দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

জলবায়ু আলোচনার ধীরগতি ও জটিল প্রক্রিয়াও সমালোচনার মুখে পড়েছে। চুক্তির নিয়মকানুন চূড়ান্ত করতেই পাঁচ বছরের বেশি সময় লেগেছিল। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতির নিয়ম থাকায় কিছু দেশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আটকে দিতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর বিষয়টিও জলবায়ু আলোচনায় সরাসরি গুরুত্ব পেতে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু কাঠামো সনদ স্বাক্ষরের পর ৩০ বছরের বেশি সময় লেগেছে। ২০২৩ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বিষয়ে দেশগুলো একমত হলেও এর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বা বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্যারিস চুক্তি থেকে সরে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি বর্তমানে বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রায় আট ভাগের এক ভাগের জন্য দায়ী। এদিকে অস্ট্রেলিয়া জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করেনি, আর তুরস্ক কার্বন নিঃসরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাজ্য নতুন গ্যাসক্ষেত্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছে এবং নতুন তেলক্ষেত্র নিয়েও ভাবছে। একই সময়ে ধনী দেশগুলোর অনেকেই দরিদ্র দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়নে অবদান কমাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বেড়ে যাওয়ায় প্যারিস চুক্তির ধীরগতির কাঠামো আরও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ২০১৫ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল প্রতি দশকে প্রায় শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে তা বেড়ে প্রতি দশকে শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়িয়েছে এবং এই গতি আরও বাড়ছে।

পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক ইয়োহান রকস্ট্রমের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকা, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রমের আশঙ্কা এবং পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি-সবকিছুই জলবায়ু উদ্যোগের বড় ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। তবে তাঁর মতে, প্যারিস চুক্তি ছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলার জন্য সবার অংশগ্রহণে কার্যকর কোনো বিকল্প কাঠামো নেই।

পানামার সাবেক জলবায়ু দূত হুয়ান কার্লোস মন্টেরেরিও মনে করেন, প্যারিস চুক্তি বিশ্বকে সঠিক পথে এগোনোর নৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে। অগ্রগতির গতি প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও চুক্তিটি দেশগুলোকে একটি অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করেছে।

চুক্তির বাইরে নতুন উদ্যোগ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অগ্রগতি

প্যারিস চুক্তি ও কপ সম্মেলনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ থেমে নেই। ২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বিষয়ে শক্তিশালী ঘোষণা না আসার পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে কলম্বিয়ায় প্রায় ৬০টি দেশ বিকল্প একটি বৈঠকে অংশ নেয়। সেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সরে আসতে নিজস্ব জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে একমত হয় দেশগুলো। ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে এ ধরনের পরিকল্পনা তৈরি করেছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, কালো কার্বন এবং শীতলীকরণে ব্যবহৃত এইচএফসি গ্যাসের মতো দূষণকারী উপাদানের নিঃসরণ কমানোও জরুরি। মিথেন নিঃসরণ ৪০ শতাংশ কমানো গেলে আগামী দশকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানো সম্ভব হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি নিঃসরণ কমাতে পারলে ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম রাখা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রেও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানে বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট ও জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। দেশটির মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখন সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে। ভিয়েতনামেও চীনের সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বেড়েছে; দেশটির গাড়ি বিক্রির ৪০ শতাংশের বেশি এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন ও ভবনের জ্বালানি ব্যবস্থাকে বিদ্যুতের আওতায় আনা কার্বন নিঃসরণ কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি ও জলবায়ু নীতিবিষয়ক অধ্যাপক জান রোজেনোর হিসাবে, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা গেলে উন্নত দক্ষতার কারণে বিশ্বের মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

এবারের কপ৩১ সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারের ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তাব আলোচনায় আসতে পারে। বর্তমানে এই হার প্রায় ২৩ শতাংশ। এমন লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ আরও গতি পেতে পারে।

কপ সম্মেলন কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ

২০২৬ সালের কপ৩১ সম্মেলন তুরস্কে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আর সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছে অস্ট্রেলিয়া। দুই দেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন, বিদ্যুতায়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বিষয়ে অগ্রগতির প্রত্যাশা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্মেলনে যে সিদ্ধান্তই আসুক, তা জলবায়ু সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট হবে না।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোটের চেয়ার ও পালাউয়ের রাষ্ট্রদূত ইলানা সেইডের মতে, কপ সম্মেলন দেশগুলোকে অভিজ্ঞতা বিনিময়, সহযোগিতা এবং সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্তিত্বের সংকটে থাকা দ্বীপরাষ্ট্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই মঞ্চ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নেপালের অ্যাকশনএইডের নির্বাহী পরিচালক সুজিতা মাথেমা বলেন, হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জলবায়ু সংকট শুধু বস্তুগত ক্ষতি নয়; এটি ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক বিপর্যয়েরও কারণ। তাঁর মতে, কপ সম্মেলনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতিগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের সার্বিক মূল্যায়ন হলো, প্যারিস চুক্তি বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পথে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সব দেশের অংশগ্রহণে এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রয়োজন এখনো রয়েছে। তাই শুধু দুই সপ্তাহের সম্মেলন নয়, সারা বছরজুড়ে সরকারগুলোর নীতি, অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ১৬.৫ ডিগ্রি, জেঁকে বসছে শীত

শীতের আগেই বৃষ্টিতে ডুবছে গাজা, চরম বিপাকে লাখো ফিলিস্তিনি

দুই মাসে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ল ৭.৫২%, সবচেয়ে বেশি বাড়ল যে পণ্যের

30th U.S. Trade Show 2026 Inaugurated in Dhaka to Strengthen Bangladesh-U.S. Trade Ties

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে ঢাকায় শুরু হলো ৩০তম ইউএস ট্রেড শো ২০২৬

কপ৩১-এর আগে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের ঐক্যের ডাক

এশিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রকৃতির মূল্য সংযোজনের উদ্যোগ জাতিসংঘের

ত্রাণ কমেছে, বেড়েছে ভয় : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারী ও শিশুদের বোবা কান্না

গাজায় ৭ কোটি টন ধ্বংসাবশেষ: পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা

বিশ্বে জনমিতিতে বড় পরিবর্তন: জন্ম-মৃত্যুর ব্যবধানে শীর্ষে যে দেশগুলো

অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল যেন নীরব ঘাতক! অজান্তেই খাবারে মিশছে বিষাক্ত সিসা

জ্বালানি সংকটের ধাক্কায় দেশে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের রেকর্ড বিক্রি