
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে বদলে যেতে পারে পৃথিবীতে বজ্রপাতের ধরন ও প্রবণতা। উষ্ণ বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং ঝড়ের মেঘ তৈরির অনুকূল পরিবেশ বজ্রঝড়ের কার্যক্রম বাড়াতে পারে। এর ফলে কিছু অঞ্চলে বজ্রপাতের প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি শুষ্ক বজ্রপাত থেকে ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এমনকি দাবানল থেকে তৈরি হতে পারে বিশেষ ধরনের বজ্রঝড়, যা নতুন করে আগুন ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও বিভিন্ন জলবায়ু পূর্বাভাসের বরাত দিয়ে সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে প্রায় ৬০ বার বজ্রপাত হয়। প্রতিটি বজ্রপাতের শক্তি সর্বোচ্চ ৭ গিগাজুল পর্যন্ত হতে পারে। বজ্রপাতের সময় আশপাশের বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় পাঁচ গুণ।

বজ্রপাত শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে। এটি বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন চক্রে সহায়তা করে, উদ্ভিদের জন্য নাইট্রোজেন সহজলভ্য করতে ভূমিকা রাখে এবং মিথেনের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস ভাঙার প্রক্রিয়াতেও অবদান রাখে। তবে এর ভয়াবহ দিকও রয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বজ্রপাতের শিকার হন এবং এতে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
উষ্ণতায় বাড়তে পারে বজ্রপাত
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস ওপরে উঠে ঝড়ের মেঘের ঠান্ডা স্তরে পৌঁছালে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র বরফকণায় পরিণত হয়। এসব বরফকণা ও নরম বরফের কণার মধ্যে সংঘর্ষের ফলে বৈদ্যুতিক চার্জের বিভাজন ঘটে। মেঘের ভেতরে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের পার্থক্য বেড়ে গেলে হঠাৎ বৈদ্যুতিক শক্তি নির্গত হয়, যা বজ্রপাত হিসেবে দেখা যায়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ধারণের ক্ষমতাও বাড়ে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তাপ ঝড়ের মেঘের ভেতরে শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে উষ্ণতা বাড়লেই পৃথিবীর সব অঞ্চলে বজ্রপাত বাড়বে, এমনটি নিশ্চিত নয়। সম্প্রতি বজ্রপাতবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের সংখ্যা ১১ শতাংশ কমা থেকে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। সব পূর্বাভাসের গড় হিসাবে প্রতি ডিগ্রি উষ্ণতায় বজ্রপাতের প্রবণতা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলোতে বজ্রপাত বাড়ার বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণায় মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে। তবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এর প্রভাব কেমন হবে, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ডাউডি বলেন, উষ্ণ পৃথিবীতে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের অনুকূল কিছু পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বজ্রপাত কীভাবে বদলাবে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দাবানলের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে শুষ্ক বজ্রপাত
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে শুষ্ক বজ্রপাত। এ ধরনের বজ্রপাতে মেঘ থেকে বিদ্যুৎ মাটিতে পৌঁছালেও সঙ্গে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয় না। ফলে শুকনো বনভূমি, ঘাস ও গাছপালায় আগুন ধরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জরুরি ব্যবস্থাপনা নেতাদের একটি সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনগুলোতে ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে শুষ্ক বজ্রপাতের সংখ্যা আগের দুই দশকের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। এতে দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ুবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ডাউডির মতে, বজ্রপাত প্রাকৃতিকভাবে দাবানল শুরুর অন্যতম উৎস। মানুষের কারণে সৃষ্ট আগুনের তুলনায় বজ্রপাত থেকে শুরু হওয়া আগুন গড়ে অনেক বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, এসব বজ্রপাত প্রায়ই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে, যেখানে দ্রুত অগ্নিনির্বাপণকারী দল পৌঁছানো কঠিন। একই সময়ে একাধিক স্থানে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটতে পারে।
২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের সূত্রপাত হয়েছিল একটি বড় বজ্রঝড় থেকে। ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে সেখানে ১ হাজার ২০০টির বেশি বজ্রপাত মাটিতে আঘাত হানে। তবে শুধু বজ্রপাতই এসব দাবানলের কারণ নয়। শুষ্ক আবহাওয়া, প্রবল বাতাস ও উচ্চ তাপমাত্রাও আগুন ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল।
দাবানল থেকেই তৈরি হচ্ছে ভয়ংকর বজ্রঝড়
বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো দাবানল থেকে সৃষ্ট বিশেষ ধরনের বজ্রঝড়। দাবানল অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠলে আগুন থেকে নির্গত তাপ ও জলীয় বাষ্প মিলে বিশাল বজ্রমেঘ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের মেঘকে বলা হয় ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ বা পাইরোসিবি (PyroCb)।
সাধারণ বজ্রমেঘের তুলনায় এসব মেঘ অনেক বেশি উচ্চতায় উঠে যেতে পারে। কখনো কখনো এগুলো বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আগুনের প্রচণ্ড তাপে তৈরি শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ ধোঁয়া, আর্দ্রতা ও উত্তপ্ত বাতাসকে দ্রুত ওপরের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে বরফকণা তৈরি ও সংঘর্ষের মাধ্যমে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়।

গত এক দশকে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও রাশিয়ায় এ ধরনের বজ্রঝড়ের ঘটনা বেড়েছে। চলতি বছর ইউরোপেও ভয়াবহ দাবানলের সময় এমন বজ্রঝড়ের খবর পাওয়া গেছে।
নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণা কেন্দ্রের অধ্যাপক জেসন ইভান্স জানান, অস্ট্রেলিয়ায় পাইরোসিবি ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৯-২০২০ সালের ভয়াবহ দাবানলের মৌসুমে এ ধরনের বজ্রঝড়ের সংখ্যা আগের ৪০ বছরের মোট ঘটনার প্রায় সমান ছিল।
এ ধরনের বজ্রঝড় শুধু দাবানলের ফল নয়, বরং নতুন করে আগুন ছড়িয়ে দেওয়ারও কারণ হতে পারে। বজ্রপাত ও প্রবল বাতাসের সঙ্গে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে নতুন এলাকায় দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্ল্যাক স্যাটারডে দাবানলের সময় প্রায় ১৫ কিলোমিটার উচ্চতায় তৈরি একটি পাইরোসিবি মেঘ থেকে সৃষ্ট বজ্রপাত মূল আগুনের সম্মুখভাগ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে নতুন আগুনের সূত্রপাত করেছিল।
অধ্যাপক ইভান্সের মতে, একবার এ ধরনের বজ্রঝড় তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে অগ্নিনির্বাপণকারী উড়োজাহাজের পক্ষেও কাছাকাছি গিয়ে পানি ছিটানো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বদলে যাচ্ছে বজ্রপাতের ভৌগোলিক বিস্তারও
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর ৮০ শতাংশের বেশি বজ্রপাত স্থলভাগে ঘটে। মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চল এবং হিমালয়সংলগ্ন এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি। ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদসংলগ্ন ক্যাটাটুম্বো অঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে বজ্রপাতপ্রবণ স্থানগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বছরে ১৪০ থেকে ১৬০ রাত পর্যন্ত বজ্রঝড় হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বজ্রঝড়ের কার্যক্রম বেড়েছে। অন্যদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উত্তরের কিছু এলাকায় তা কমেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ গোলার্ধে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ মেরুর দিকে সরে যাওয়ার প্রবণতাও শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।
সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের ভবিষ্যৎ প্রবণতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো গবেষণা চলছে। তবে শুষ্ক বজ্রপাত, দাবানল থেকে তৈরি বজ্রঝড় এবং আগুনের নতুন বিস্তার ইতিমধ্যে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এসব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হলে ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিতেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।