ঢাকাবুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহিতা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৯ সকাল

Link Copied!

জাতীয় সংসদে গত ৬ সেপ্টেম্বর পাস হওয়া ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বিল, ২০৬’ দেশের মানবাধিকার ব্যবস্থার মানোন্নয়নের পরিবর্তে এর স্বাধীন কাঠামোকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (এএনএনআই) এবং এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ফোরাম-এশিয়া)। বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মুখে পাস হওয়া এই নতুন আইনটি ২০০৯ সালের পুরোনো আইনকে প্রতিস্থাপন করলেও এটি কমিশনের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের মূল দাবিগুলোকে অবমূল্যায়ন করেছে বলে জানিয়েছে সংস্থা দুটি।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এএনএনআই ও ফোরাম-এশিয়া এই উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিবৃতিটিতে বলা হয়, জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর হতে হলে কেবল আইনি সুরক্ষাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত সম্পদ এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার শতভাগ অনুকূল পরিবেশ। কিন্তু নতুন আইনটি ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং অনেক ক্ষেত্রে ২০০৯ সালের আইনের তুলনামূলক ইতিবাচক বিধান থেকেও একধরণের পিছিয়ে পড়ার শামিল।

পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
২০১১ ও ২০১৫ সালে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অফ ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস-এর এসিএ রিভিউ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসিবি) দীর্ঘদিন ধরে ‘বি’ স্ট্যাটাসে রয়েছে। যা কমিশনের স্বাধীনতা, ম্যান্ডেট, তদন্ত ক্ষমতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভুত্থান এবং পরবর্তী নভেম্বরে সব কমিশনারের পদত্যাগের পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় ২০২৫ সালে একটি শক্তিশালী অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছিল। ওই অধ্যাদেশে কমিশনের স্বাধীনতা, স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ার এবং সদস্য নিয়োগে স্বচ্ছতা ও বহুত্ববাদ নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সংসদ পূর্বের সেই অধ্যাদেশটি বাতিল করে এবং এ মাসের প্রথম দিকে বিতর্কিত এনএইচআরসি বিল ২০২৬ পাস করে। এর ফলে মানবাধিকার কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

কার্যনির্বাহী প্রভাবমুক্ত স্বাধীন কমিশনের অভাব :
বিশ্বাসযোগ্য একটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে সরকার বা নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে কাঠামোগত ও কার্যগতভাবে স্বাধীন হতে হয়। কিন্তু নতুন আইনে সেই নিশ্চয়তা মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

কমিশনের সিলেকশন বা বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সদস্য হিসেবে আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি, সরকারের অধীনে প্রেষণ, লিয়েন বা অবৈতনিক ছুটিতে থাকা সরকারি কর্মকর্তারাও যাতে কমিশনার হতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা হয়েছে—যা স্পষ্টতই স্বার্থের সংঘাত এবং কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা ‘প্যারিস প্রিন্হিপলস’-এর সঙ্গে এই বিধানগুলো সাংঘর্ষিক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ সংকোচন :
নতুন বিলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করা। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে, গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতা এনএইচআরসির থাকা কতটা জরুরি।

নতুন আইনে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কমিশনকে সরাসরি স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু না করে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছ থেকে জবাব চাওয়া বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করার অদ্ভুত বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, তারাই নিজেদের তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এটি বাংলাদেশের সংবিধানের সমতা বিধানের নীতিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে, কারণ অপরাধী যদি আইনপ্রণেতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়, তবে ভুক্তভোগীরা তুলনামূলক কম সুরক্ষা এবং প্রতিকার পাবেন।

ইতিবাচক কিছু দিক থাকলেও মূল সংকট সমাধান হয়নি :
সংস্থা দুটি বলছে, বিলটিতে কিছু ইতিবাচক ধারাও রয়েছে। যেমন—কমিশনারদের মধ্যে নারী এবং জাতিগত সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পূর্বের ধারাগুলো অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে (যদিও এগুলো নতুন কোনো সংযোজন নয়)। পাশাপাশি, বেশিরভাগ আটকে থাকা আটককেন্দ্রে যাওয়ার জন্য পূর্বানুমতির শর্ত বাতিল করাকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে সাধুবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

তবে এএনএনআই ও ফোরাম-এশিয়া স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই ছোটোখাটো সংশোধনীগুলো মূল সংকট দূর করতে পারে না। যে প্রতিষ্ঠানের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করার স্বাধীন ক্ষমতা নেই, তা কখনোই কার্যকর হতে পারে না।

জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত সংস্কারের বড় সংকট :
মানবাধিকার কমিশনের এই বিতর্কিত বিল পাসের পাশাপাশি একই সময়ে আরও কিছু আইন পাস হওয়ায় জবাবদিহিতার সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে সংশয় আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পাস হয়। গুমের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আলাদা আইন থাকা ইতিবাচক হলেও রাষ্ট্রীয় এজেন্টরা জড়িত থাকলে তদন্তের প্রকৃত স্বাধীনতা ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

একইভাবে, গত ১০ সেপ্টেম্বর পাস হওয়া ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যা ব) জনবল, সম্পদ এবং রেকর্ড নতুন একটি বাহিনীতে স্থানান্তরের বিধান করা হয়েছে। কার্যকর ভেটিং প্রক্রিয়া, স্বাধীন তদারকি এবং প্রমাণ সংরক্ষণের স্থায়ী সুরক্ষা ছাড়া কেবল প্রতিষ্ঠানের নাম বদলানো বা রূপান্তর করা হলে আগের জবাবদিহিতার ঘাটতিগুলোই পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মানবাধিকারের স্থাপত্য শক্তিশালী করার দাবি:
জাতিসংঘের প্যারিস প্রিন্সিপালসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাধীন, কার্যকর ও নিরপেক্ষভাবে এনএইচআরসির কার্যক্রম পরিচালনার জোর দাবি জানিয়েছে এএনএনআই ও ফোরাম-এশিয়া।

সংস্থাগুলোর মতে, একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতাই একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গড়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশ যখন কাঠামোগত ও আইনি সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই সংস্কারগুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাধীন মানবাধিকার তদারকি ও জবাবদিহিতাকে আরও শক্তিশালী করা, সংকুচিত নয়।

বিবৃতিটির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান— অধিকার, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেন্টরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটসহ এএনএনআই ও ফোরাম-এশিয়ার অন্য সদস্যবৃন্দ।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সংঘাত তীব্র হওয়ায় ইয়েমেনে বড় ধরনের শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা

স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহিতা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

ডেঙ্গু চিকিৎসায় ৪০ জেলায় ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে বিশেষ প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়ল বাসভাড়া

899 Public Transport Drivers Trained Under BRTA and DAM Initiative

বিআরটিএ ও ডামের উদ্যোগে ৮৯৯ গণপরিবহন চালককে প্রশিক্ষণ

ঈশ্বরদীতে বাসচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

মান্দায় বাসচাপায় চার্জারভ্যান চালক নিহত

নিম্নচাপের প্রভাবে সারাদেশে বৃষ্টি, কোথাও হতে পারে অতি ভারী বর্ষণ

চট্টগ্রাম বিভাগের সরকারি দপ্তরে শতভাগ তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের উদ্যোগ

ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার পরিহারের দাবি পরিবেশবাদীদের