
মাদকাসক্তি কোনো অপরাধ বা নিছক ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। মাদকাসক্তির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ডুয়াল ডায়াগনসিস’ হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের রোগীর টেকসই সুস্থতা নিশ্চিত করতে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের সচেতনতা, মানসিক সমর্থন এবং ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বুধবার (১২ আগস্ট) ঢাকার শ্যামলীতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় রোগীদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ ‘ফ্যামিলি এডুকেশন মিটিং’-এ প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে এসব কথা বলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাহানুল ইসলাম, সেন্ট্রাল ড্রাগ এডিকশন ট্রিটমেন্ট সেন্টার (ঢাকা)।
তিনি বলেন, অনেক সময় তীব্র মানসিক কষ্ট, বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে মানুষ মাদকের আশ্রয় নিতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও রাসায়নিক ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে, যার ফলে গুরুতর মানসিক সমস্যা, এমনকি সাইকোসিসও দেখা দিতে পারে। ফলে মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ একসঙ্গে থাকলে রোগীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের দ্বৈত সংকটে রোগীর আচরণে হঠাৎ তীব্র উত্তেজনা, আক্রমণাত্মক আচরণ, বিভ্রান্তি বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের আতঙ্কিত বা উত্তেজিত না হয়ে শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকতে হবে। রোগীকে মারধর, অপমান বা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার মতো কোনো অমানবিক পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পেশাদার চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
রিহ্যাবিলিটেশন বা চিকিৎসা শেষে রোগী বাড়ি ফেরার পর পরিবারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রিহ্যাব থেকে ফিরে আসাই চিকিৎসার শেষ ধাপ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায়। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে রোগীকে অতীতের ভুলের জন্য বারবার দোষারোপ করা, অপমান করা কিংবা অতিরিক্ত সন্দেহ করা হলে তার ওপর মানসিক চাপ বাড়তে পারে এবং পুনরায় মাদক গ্রহণ বা ‘রিল্যাপস’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বক্তারা বলেন, রোগীর সুস্থতা ধরে রাখতে পরিবারকে একটি নিরাপদ, সহযোগিতাপূর্ণ, চাপমুক্ত ও মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ, ওষুধ গ্রহণ, কাউন্সেলিং এবং পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রের চিকিৎসারত ক্লায়েন্টদের অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখি গাঙ্গুলী, কেন্দ্র ব্যবস্থাপক লায়লা ইয়াসমিন, কেস ম্যানেজার আফসানা খাতুন ও ফারজানা ডেরোস এবং কেন্দ্রের কাউন্সেলররা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় পরিবারের সদস্যদের মাদকাসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়, চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যা এবং রিল্যাপস প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন করা হয়। আলোচনায় পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি রোগীর সুস্থতা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় পরিবারকে চিকিৎসা দলের অংশীদার হিসেবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।