ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৫ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ছে, অর্থায়ন বাড়ছে না: জাতিসংঘ

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৬ সকাল

Link Copied!

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার জন্য ধনী দেশগুলোর অর্থায়ন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালের পর থেকে এ খাতে আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ বাড়ার পরিবর্তে স্থবির বা নিম্নমুখী রয়েছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ১৫৫টি উন্নয়নশীল দেশের বছরে ৩০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। বিপরীতে, ২০২৪ সালে ধনী দেশগুলো থেকে এসব দেশে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য অর্থ এসেছে সর্বোচ্চ ৩২ বিলিয়ন ডলার।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির (ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম) নতুন এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘অ্যাডাপটেশন গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: রেডি? নট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়লেও তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাপপ্রবাহ, দাবানল, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০৩৫ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বছরে প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে অবকাঠামো শক্তিশালী করা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বন্যা প্রতিরোধ এবং খরা সহনশীল সেচব্যবস্থা উন্নয়নের মতো কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কিন্তু ২০২৪ সালে উন্নত দেশগুলো থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য আন্তর্জাতিক সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ২ থেকে ৩১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এ অর্থায়ন বেড়েছে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় অর্থপ্রবাহ কমে গেছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মধ্যে জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে লক্ষ্য ছিল, বর্তমান অর্থপ্রবাহ সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট দ্রুত বাড়ছে না। যদিও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো ২০২৫ সালে অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে থাকতে পারে। ফলে লক্ষ্য পূরণের কিছু সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থায়ন তিন গুণ হলেও চাহিদার বড় অংশ অপূর্ণ থাকবে

গত বছর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০-এ ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন অন্তত তিন গুণ বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলেও বছরে অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৮৫ থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলার। এতে ২০৩৫ সালের মোট অর্থায়ন চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ২৯ শতাংশ পূরণ হবে। অর্থাৎ অর্থায়ন তিন গুণ বাড়লেও প্রয়োজনীয় অর্থের বড় অংশের ঘাটতি থেকেই যাবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ ও ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর আর্থিক সামর্থ্য তুলনামূলকভাবে কম। এসব দেশের বছরে ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার অভিযোজন অর্থায়ন প্রয়োজন, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ। উচ্চ-মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় এ আর্থিক চাপ প্রায় দ্বিগুণ।

অথচ ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশগুলো ২০২২ সালের তুলনায় জলবায়ু অভিযোজন খাতে ১৬ শতাংশ কম অর্থায়ন পেয়েছে।

জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৭৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ

প্রতিবেদনে জলবায়ু দুর্যোগের মানবিক ক্ষতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত ৭৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের ৯৯ শতাংশই ছিলেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বাসিন্দা।

জাতিসংঘের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যু কিংবা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রকৃত ক্ষতির অনেক কিছুই হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় গঠিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এ অর্থের চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা দিয়েছে। তহবিলটির প্রথম দফায় ১১৯টি উন্নয়নশীল দেশ মোট ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়েছে। বিপরীতে, প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৪২ মিলিয়ন ডলার।

জলবায়ু অভিযোজনে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান

ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসেন বলেছেন, শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার পরিস্থিতি এখন প্রায় অনিবার্য। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র, ঘন ঘন এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, যেসব দেশ জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বৈশ্বিক সক্ষমতা ও সহনশীলতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া, বাস্তুচ্যুতি প্রতিরোধ এবং বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু অর্থের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, অর্থায়নের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে উচ্চ সুদের ঋণের পরিবর্তে অনুদান ও স্বল্প সুদের ঋণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সমুদ্র উপকূল সুরক্ষা বাঁধ, তাপপ্রবাহ থেকে সুরক্ষার আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা অন্যান্য অভিযোজন প্রকল্প থেকে সরাসরি আয় হওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধ করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ ও ইকুইটি অর্থায়নের ব্যয় কোনো কোনো অভিযোজন প্রকল্পের বাজেট দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এদিকে আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১। সম্মেলনে জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানো এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন জলবায়ু অধিকারকর্মীরাও।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সারকথা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজনের তুলনায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন অনেক কম। সময়মতো অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় এসব দেশের সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা (ইউএনইপি), দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ডলারের চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি

টানা দুই দফায় আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি কত?

১২ দেশে যেতে আগ্রহীদের জন্য মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তা

হামের টিকা সংগ্রহে বিলম্বের কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের কমিশন

সাংবাদিক হত্যায় বিশ্বজুড়ে বাড়ছে বিচারহীনতা: ৭ জনের ৬ জনেরই বিচার হয় না

নিউজিল্যান্ডে বাড়ছে বেকারত্ব, কমছে কর্মসংস্থান

মহাকাশে তৈরি হচ্ছে ক্যানসারের ওষুধের উপাদান!

দেশের ১৫ হাজার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা সরকারের

দুই দিন পরই আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম

ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, হামের উপসর্গেও প্রাণ গেল ৬ জনের

যশোরে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল কলেজছাত্রের

নওগাঁয় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যু