
পৃথিবী থেকে প্রায় ৩০০ মাইল ওপরে মহাকাশে ওষুধ তৈরির পরীক্ষা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের পাঠানো তিনটি স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযানের একটি ক্যাপসুলে মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরিবেশে সম্ভাব্য ক্যানসারের ওষুধের ক্ষুদ্র স্ফটিক তৈরি করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাকাশের প্রায় ওজনহীন পরিবেশে স্ফটিক তৈরির প্রক্রিয়া আরও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে ওষুধের গুণগত বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগপদ্ধতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে; মহাকাশে তৈরি ওষুধ রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারের মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর ৪ নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Varda Space Industries এই উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ১ অক্টোবর একই রকেটে দুটি মহাকাশযান পাঠায়। পরে ২০ অক্টোবর পাঠানো হয় তৃতীয়টি। প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটির তিনটি মহাকাশযান একই সময়ে পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থান করছে।
প্রায় ওয়াশিং মেশিনের আকারের এসব ক্যাপসুলের মধ্যে একটিতে সম্ভাব্য ক্যানসারের ওষুধের স্ফটিক তৈরির পরীক্ষা চলছে। অন্য দুটি ক্যাপসুলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে দ্রুতগতিতে প্রবেশের সময় তাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার উপকরণ এবং নেভিগেশনব্যবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষার কাজ শেষ হলে ক্যাপসুলগুলো মহাকাশযান থেকে আলাদা হয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং প্যারাসুটের সাহায্যে জনবসতিহীন এলাকায় অবতরণ করবে।
মহাকাশে স্ফটিক তৈরির সুবিধা কী
মহাকাশে ওষুধ তৈরির পরীক্ষার অন্যতম কারণ হলো মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা প্রায় ওজনহীন পরিবেশ। পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণের কারণে তরলের মধ্যে থাকা কণাগুলো নিচে বসে যায়। ঘনত্বের পার্থক্য থেকেও তরলে প্রবাহ তৈরি হয়। এসব কারণে স্ফটিকের বৃদ্ধি ও গঠন ব্যাহত হতে পারে। কিন্তু মহাকাশের মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশে এ ধরনের প্রভাব কম থাকায় স্ফটিক তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খলভাবে তৈরি হওয়ার সুযোগ পায়।
যুক্তরাজ্যের স্যাটেলাইট অ্যাপ্লিকেশনস ক্যাটাপল্টের মহাকাশে উৎপাদনবিষয়ক মিশন ব্যবস্থাপক ড. মেগান ক্রিশ্চিয়ানের মতে, মাধ্যাকর্ষণের এসব প্রভাব দূর করা গেলে স্ফটিক আরও সুশৃঙ্খলভাবে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
ওষুধের ক্ষেত্রে স্ফটিকের আকার, আকৃতি ও বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ। এসব বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে কোনো ওষুধ কত দ্রুত দ্রবীভূত হবে, কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং কীভাবে শরীরে প্রয়োগ করা যাবে। ফলে মহাকাশে স্ফটিক তৈরির প্রযুক্তি সফল হলে কিছু ওষুধের প্রস্তুতপ্রণালি উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এমনকি বর্তমানে শিরায় (ইনট্রাভেনাস) প্রয়োগ করতে হয়-এমন কিছু ওষুধকে ভবিষ্যতে তুলনামূলক সহজ ইনজেকশন হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এটি এখনো সম্ভাবনা, প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাপদ্ধতি নয়।
শুধু ওষুধ নয়, সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতেও আগ্রহ
মহাকাশে উৎপাদনের সম্ভাবনা শুধু ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্মার্টফোন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি-বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতেও মাইক্রোগ্র্যাভিটি কাজে লাগতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাকাশের পরিবেশে তুলনামূলক বিশুদ্ধ স্ফটিক এবং কম ত্রুটিযুক্ত উপাদান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে উন্নত মানের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে মহাকাশে উৎপাদনের ধারণা একেবারে নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) মাইক্রোগ্র্যাভিটি ব্যবহার করে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। কিন্তু আইএসএস মূলত গবেষণা ও পরীক্ষার জন্য তৈরি; বাণিজ্যিক উৎপাদনের উপযোগী করে নির্মিত হয়নি। স্টেশনটি ২০৩০ সালের দিকে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে আইএসএসের বিকল্প হিসেবে বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন এবং বিশেষায়িত গবেষণাগার তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
মানুষ ছাড়াই চলবে মহাকাশের কারখানা
ভারদার মহাকাশযানগুলোকে বলা হয় ‘ফ্রি-ফ্লায়ার’। স্পেসএক্সের রকেটের মাধ্যমে এগুলো পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছায়। প্রতিটি মহাকাশযানে থাকে ছোট আকারের স্বয়ংক্রিয় গবেষণাগার, যেখানে নভোচারীর সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই বিভিন্ন উপাদান প্রক্রিয়াজাত করা যায়।
গবেষকদের মতে, বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষকে সরাসরি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের উপস্থিতি, নড়াচড়া ও কম্পন পরীক্ষার পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। স্বয়ংক্রিয় গবেষণাগার এসব প্রভাব কমিয়ে নির্দিষ্ট পরিবেশে পরীক্ষা চালানোর সুযোগ দেয়।
ভারদা ইতোমধ্যে কক্ষপথ থেকে কয়েকটি ক্যাপসুল পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালে আরও সাতটি এবং ২০২৮ সালে ১০টি মিশন পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে। নিয়মিত বিরতিতে পরীক্ষা চালানো ও ফলাফল যাচাইয়ের মাধ্যমে মহাকাশে উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
ভারদার প্রধান কৌশল কর্মকর্তা মাইকেল রেইলি বলেছেন, ওষুধ উন্নয়নের আধুনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ বিরতিতে পরীক্ষা চালানোর বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনো পরীক্ষার জন্য এক বছর বা ১০ বছর অপেক্ষা করতে হলে গবেষণার গতি ব্যাহত হয়। তাই ঘন ঘন মহাকাশ মিশন পরিচালনা করা ওষুধ উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাণিজ্যিক উৎপাদনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
মহাকাশে ওষুধ বা অন্যান্য উপাদান উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও এ প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সাফল্য এখনো নিশ্চিত নয়। মহাকাশে কোনো পণ্য তৈরি করতে উৎক্ষেপণ, গবেষণা, নমুনা ফিরিয়ে আনা এবং অন্যান্য কার্যক্রমে বিপুল ব্যয় হয়। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বাড়তি সুবিধা সেই ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট মূল্যবান কি না, তা প্রমাণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ধরনের পণ্য মহাকাশে তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। যেসব উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে মাইক্রোগ্র্যাভিটির সুবিধা উল্লেখযোগ্য, সেগুলোর উৎপাদনই প্রথমে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি একই মান ও ফলাফল বারবার নিশ্চিত করার সক্ষমতাও দেখাতে হবে।
এ ছাড়া মহাকাশে উৎপাদিত ওষুধের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন ও নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যুক্তরাজ্যের মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ) মহাকাশে তৈরি ওষুধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ওষুধ নিয়ন্ত্রণবিধি কীভাবে প্রয়োগ হবে, সে বিষয়ে একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহাকাশে উৎপাদন নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাজ্যের বায়োঅরবিট এবং কার্ডিফভিত্তিক স্পেস ফোর্জের মতো প্রতিষ্ঠানও। বায়োঅরবিট ক্যানসারের ওষুধ তৈরির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ছোট আকারের গবেষণাগার পাঠিয়েছে। অন্যদিকে স্পেস ফোর্জ মহাকাশে সেমিকন্ডাক্টরের স্ফটিক তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের আগে উৎপাদিত উপাদান পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া প্রদর্শন করা।
সব মিলিয়ে, মহাকাশে ওষুধ ও শিল্প-উপাদান উৎপাদনের উদ্যোগ নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। তবে এ প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর ও লাভজনক হবে, তা নির্ভর করছে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ওপর। আপাতত এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন কোনো ওষুধ আবিষ্কারের নিশ্চিত ঘোষণা নয়; বরং ভবিষ্যতে ওষুধ তৈরির পদ্ধতি বদলে দিতে পারে-এমন একটি পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি।
তথ্যসুত্র: দ্য গার্ডিয়ান