
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকি দিয়েছে—এমন অভিযোগে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনকে আমলে নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রতিবেদন চেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। গত ১৭ আগস্ট দৈনিক ইনকিলাবে ‘বিএটির শতকোটি টাকা কর ফাঁকি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ বিষয়ে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে এনবিআরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ২৩ আগস্ট ২০২৬ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৫ মো. আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে ইনকিলাবে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন জরুরি ভিত্তিতে পাঠাতে বলা হয়েছে। চিঠির সঙ্গে সংবাদ প্রতিবেদনটির দুই পৃষ্ঠার কপিও সংযুক্ত করা হয়েছে।
ইনকিলাবের প্রতিবেদনে বিএটিবির আয় গোপন, করযোগ্য আয় কম দেখানো, ব্যান্ডরোল বা ট্যাক্স স্ট্যাম্পের অপচয় দেখিয়ে রাজস্ব কম দেওয়া এবং বাজেটের আগে বিপুল পরিমাণ সিগারেট উৎপাদন করে পুরোনো হারে শুল্ক-কর পরিশোধের মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অডিট এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত নথির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ করবর্ষে বিএটিবি তার আয়কর রিটার্নে ২ হাজার ৭৩০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা আয় দেখায়। পরে এলটিইউর নিরীক্ষায় কোম্পানিটির আয় ২ হাজার ৯৪২ কোটি ৩১ লাখ টাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ রিটার্নে দেখানো আয়ের তুলনায় নিরীক্ষায় ২১১ কোটি ৫২ লাখ টাকা বেশি আয় পাওয়া যায়। সংবাদ প্রতিবেদনে এই অর্থকে আয় গোপনের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ও ভূমিকায় অবশ্য ২২১ কোটি টাকার কথা বলা হলেও মূল প্রতিবেদনে ২১১ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে।

এই অতিরিক্ত আয়ের ওপর করের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য ৪৫ শতাংশ করের সঙ্গে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ সারচার্জ বিবেচনায় নিলে গোপন করা আয়ের বিপরীতে শতকোটি টাকার বেশি করের প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে এটি কোম্পানির চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচনা করার আগে এনবিআরের নিরীক্ষা, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়া প্রয়োজন।
এলটিইউর নিরীক্ষায় শুধু আয় গোপনের বিষয়টিই নয়, বিএটিবির বিভিন্ন ব্যয়ের হিসাবও পরীক্ষা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন ও বিক্রয়, গ্র্যাচুইটি, মুনাফা-ক্ষতির হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয়, বিক্রয় ব্যয়, কমিশন, আইন ও সচিবালয়-সংক্রান্ত ব্যয়, নিরাপত্তা, অডিট ফি, বিতরণ, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং লভ্যাংশসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে। এসব ব্যয়ের কিছু অংশ অতিরিক্ত দেখিয়ে প্রকৃত মুনাফা ও করযোগ্য আয় কম দেখানো হয়েছে কি না, সেটিই নিরীক্ষার অন্যতম বিষয় ছিল বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিএটিবির বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির আরেকটি অভিযোগ এসেছে ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোলের অপচয় দেখানোর ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ভালো ও ব্যবহারযোগ্য স্ট্যাম্পকে অপচয় হিসেবে দেখিয়ে প্রায় ২৩ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই হারে সারা বছর চললে এর পরিমাণ প্রায় ৯২ কোটি টাকা হতে পারে—যদিও ৯২ কোটি টাকা কোনো চূড়ান্ত নিরীক্ষা-নির্ধারিত দায় নয়, বরং তিন মাসের অভিযোগের ভিত্তিতে করা বার্ষিকীকৃত হিসাব।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডার্বি, পাইলট, হলিউড, রয়্যালস, স্টার, ক্যাপস্টান, লাকি স্ট্রাইক, গোল্ড লিফ ও মার্লবোরোসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের অপচয় দেখানোর বিষয়টি এনবিআরের নজরে আসে। বিএটিবির পক্ষ থেকে কারখানা স্থানান্তর এবং শ্রমিকদের স্থানান্তরজনিত কারণে স্ট্যাম্প নষ্ট হওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও এনবিআরের কর্মকর্তারা বিপুল পরিমাণ স্ট্যাম্প এক দিনে নষ্ট হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানির কাছে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণ চাওয়া হলেও তা সন্তোষজনক ছিল না—এমন দাবিও করা হয়েছে।
এর বাইরে বাজেট ঘোষণার আগে অতিরিক্ত সিগারেট উৎপাদন ও মজুতের অভিযোগটিও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগে বিএটিবি ৩৫ কোটি ৬৫ লাখ ২ হাজার ৯৭৫ প্যাকেট সিগারেট উৎপাদন করে গুদামে মজুত রাখে। এসব সিগারেটের ওপর তখনকার বিদ্যমান হারে শুল্ক ও কর পরিশোধ করা হয়েছিল। পরে বাজেটে সিগারেটের দাম ও করহার বাড়লেও পুরোনো হারে কর দেওয়া এসব সিগারেট নতুন দামে বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়।
নথিতে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, ওই মজুদের বিপরীতে সরকার ৩ হাজার ৩৩ কোটি ৬৫ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬ টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। নতুন হারে কর আদায় হলে রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল ৩ হাজার ২৫৫ কোটি ৫২ লাখ ১ হাজার ৪২৭ টাকা। দুই হিসাবের ব্যবধান ২২১ কোটি ৮৬ লাখ ৩ হাজার ৩৪১ টাকা। তবে সংবাদ প্রতিবেদনে রাজস্ব ফাঁকির অঙ্ক হিসেবে ২১০ কোটি ৮৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৪২ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাবের পার্থক্যও এনবিআরের তদন্তে স্পষ্ট হওয়ার বিষয় রয়েছে।
এই ঘটনায় এলটিইউ-ভ্যাট বিএটিবিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মূল প্রশ্ন হচ্ছে—বাজেটের আগে উৎপাদিত ও কর পরিশোধ করা সিগারেট পরবর্তী সময়ে নতুন নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা হলে অতিরিক্ত মূল্যের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক-কর আদায় হয়েছে কি না।
এদিকে বিএটিবির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু কর ও রাজস্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তিভিত্তিক ও মৌসুমি শ্রমিকদের স্থায়ী করার দাবিতে আন্দোলন, কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচির ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টে কুষ্টিয়া, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকেরা ঠিকাদারি প্রথা বাতিল ও স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন। এর আগেও ২০২৫ সালে নিয়োগপত্র, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটিসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নথি চাওয়ার বিষয়টি বিএটিবির বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর প্রশাসনিক পর্যায়ে যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সংবাদ প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ এবং এনবিআরের চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত করদায় এক বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চাওয়া প্রতিবেদনে এনবিআর এসব অভিযোগের কোনগুলো নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, কোথায় রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা স্পষ্ট হওয়ার কথা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) এর কর বিশ্লেষক ইব্রাহীম খলিল বলেন, বহুজাতিক তামাক কোম্পানি বিএটিবি প্রতি বছর শুধু এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এছাড়া ব্যান্ডরোল ও স্ট্যাম্প জালিয়াতি, বাজেট প্রস্তাবে তদুর্ধ্ব শব্দে অপপ্রয়োগ ও পুরনো সিগারেট নতুন দামে বিক্রি করে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি এনবিআরের নজরে আনার চেষ্টা করেছি। দেশে ব্যবসা করতে হলে বৈধভাবে করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক। আশা করছি তাদের অতীতের রাজস্ব ফাঁকির তথ্যও বিবেচনায় এনে তদন্ত ও যথাযথভাবে আইনের প্রতিপালন করা হবে। তারা দেশের আইনকে যেভাবে চ্যালেঞ্জ ও অবজ্ঞা করে ব্যবসা পরিচালনা করছে সেটাও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।