ঢাকামঙ্গলবার , ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য
  3. নিরাপদ খাদ্য
  4. মতামত

ক্ষুদ্র মোড়ক, বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি: সতর্কীকরণ লেবেল কেন জরুরি

প্রতিবেদক
কামরুন্নিছা মুন্না
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ সকাল

Link Copied!

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার দেশের উন্নয়নের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু একই সময়ে একটি নীরব সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে—অসংক্রামক রোগ (Non-Communicable Diseases বা NCDs)। বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, স্ট্রোক, কিডনি রোগ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম (লবণ), স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ প্রক্রিয়াজাত এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের অতিরিক্ত গ্রহণ এই রোগগুলোর অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। বাংলাদেশেও শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এসব খাদ্যের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।

এই বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্য রক্ষা কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি বাংলাদেশের সংবিধান প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জনগণের পুষ্টির মান উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১৫(ক) অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ হিসেবে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা নয়, বরং এমন একটি নীতিগত ও আইনগত পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মানুষ নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত এবং তথ্যসমৃদ্ধ খাদ্য বেছে নিতে পারে। তাই খাদ্যের মোড়কে স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সংবিধান বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। এই অঙ্গীকারের সঙ্গে খাদ্যের মোড়কে সতর্কীকরণ লেবেলিংয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। SDG-3-এর লক্ষ্য হলো অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু কমানো এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। SDG-2 নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়। SDG-12 দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ভোগ নিশ্চিত করার কথা বলে। যদি ভোক্তা কোনো খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা অস্বাস্থ্যকর চর্বির উপস্থিতি সম্পর্কে সহজে জানতে না পারেন, তাহলে তিনি সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। ফলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন, রোগ প্রতিরোধ এবং দায়িত্বশীল ভোগ—এসডিজির এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যই বাধাগ্রস্ত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মোড়কাবদ্ধ খাদ্যের সম্মুখভাগে (Front-of-Pack) সহজবোধ্য সতর্কীকরণ (Warning Label) প্রদর্শনের মাধ্যমে ভোক্তাকে ক্রয়ের মুহূর্তেই জানিয়ে দেওয়া যে কোনো খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে কি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), UNICEF এবং Pan American Health Organization (PAHO) দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের ব্যাখ্যামূলক সতর্কীকরণ লেবেলকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার একটি কার্যকর নীতি হিসেবে সুপারিশ করে আসছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ জটিল পুষ্টি তথ্যের তুলনায় Warning Label অনেক দ্রুত বুঝতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করতে সক্ষম হন।

কিন্তু খসড়া প্রবিধান প্রকাশের পর শিল্পখাতের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র আকৃতির মোড়কের জন্য Front-of-Pack Warning Label থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতির দাবি তোলা হয়েছে। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ছোট প্যাকেটে পর্যাপ্ত জায়গা নেই এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে Warning Label ব্যবহার করা সম্ভব নয়। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি প্রযুক্তিগত বিষয় মনে হলেও বাস্তবে এটি জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন।

প্রথমত, পণ্যের আকার ছোট হলেই তার স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে যায় না। বরং বাংলাদেশে ১০, ২০ বা ৩০ টাকার ছোট প্যাকেটের চিপস, বিস্কুট, চকলেট, কোমল পানীয় এবং অন্যান্য অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এগুলোর প্রধান ভোক্তা শিশু, কিশোর, শিক্ষার্থী এবং নিম্নআয়ের মানুষ। অর্থাৎ যাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তাদের কাছ থেকেই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য গোপন করার সুযোগ তৈরি হবে যদি ক্ষুদ্র মোড়ককে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়। এটি ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দ্বিতীয়ত, এই অব্যাহতি জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর হবে। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস, অকালমৃত্যু এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে রাষ্ট্রকে প্রতি বছর বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। যদি মানুষ খাদ্য নির্বাচনের সময় স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে না পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ আরও বাড়বে। এর ফলে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, দরিদ্র পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার ক্ষতি—সবই বাড়বে। তাই Warning Label শুধু একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বিনিয়োগও বটে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা শিল্পখাতের দাবিকে সমর্থন করে না। চিলি, মেক্সিকো, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ ক্ষুদ্র মোড়কের জন্য সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেয়নি। বরং ছোট আকারের Warning Label, বিকল্প নকশা, Sleeve Label বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করেছে। Codex Alimentarius-এও ক্ষুদ্র মোড়কের অব্যাহতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করা হয়নি; বরং এমন ব্যতিক্রম যেন নীতির উদ্দেশ্যকে দুর্বল না করে, সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে WHO এবং PAHO-এর নির্দেশিকাও অতিরিক্ত ব্যতিক্রম বা অব্যাহতি এড়িয়ে একটি একক ও কার্যকর লেবেলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ক্ষুদ্র মোড়কে কি সত্যিই জায়গার সংকট রয়েছে? বাস্তবে দেখা যায়, ছোট প্যাকেটেও নির্মাতারা ব্র্যান্ড লোগো, আকর্ষণীয় ছবি, প্রচারণামূলক বার্তা, QR কোড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইকন এবং অন্যান্য বিপণন উপাদান যুক্ত করতে সক্ষম। যদি বিপণনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে, তাহলে জনস্বাস্থ্য রক্ষার Warning Label-এর জন্য জায়গা নেই—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে এটি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার চেয়ে নীতিগত অনীহার প্রতিফলন।

ক্ষুদ্র মোড়কের জন্য সম্পূর্ণ অব্যাহতি আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। উৎপাদকরা পণ্যের পুষ্টিগত মান উন্নত করার পরিবর্তে মোড়কের আকার ছোট করে Warning Label এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এটি একটি Regulatory Loophole তৈরি করবে, যার ফলে একই অস্বাস্থ্যকর খাদ্য ছোট ছোট প্যাকেটে বাজারজাত করে আইনের উদ্দেশ্য ব্যাহত করা সম্ভব হবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিশু-কিশোর ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী, যারা সবচেয়ে বেশি ছোট প্যাকেটের খাদ্য কিনে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী? প্রথমত, নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬ দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে এবং এর জনস্বাস্থ্যভিত্তিক মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র মোড়কের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অব্যাহতির পরিবর্তে ছোট আকারের Warning Label, Sleeve Label, Neck Label এর মতো প্রযুক্তিগত সমাধান বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে দৃশ্যমান সতর্কীকরণ লেবেল বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্পখাতকে একটি যৌক্তিক রূপান্তরকাল (transition period) দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই সময়সীমা যেন নীতির কার্যকারিতা বিলম্বিত বা দুর্বল না করে। চতুর্থত, ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ভিত্তিক পুষ্টি শিক্ষা, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং লেবেলিং বিধির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পখাতকে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য পুনর্গঠনে (reformulation) উৎসাহিত করার জন্য নীতিগত প্রণোদনাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে। SDGs সেই দায়িত্বকে বৈশ্বিক অঙ্গীকারে পরিণত করেছে। নিরাপদ খাদ্য আইন সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ক্ষুদ্র মোড়কের আকার হয়তো ছোট, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়ন। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো ব্যতিক্রম নয়—বরং কার্যকর, সর্বজনীন এবং বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ লেবেলই হওয়া উচিত বাংলাদেশের নীতিগত পথ।

লেখক : কামরুন্নিছা মুন্না, সিনিয়র নীতি বিশ্লেষক, সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ)

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সুগন্ধি চাল রফতানির কোটা ৫০ শতাংশ কমাল সরকার

ডেঙ্গুর হানা ঝালকাঠিতে, ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৩৫

পঞ্চগড়ে কুয়াশা-ঠান্ডা বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা

আগামী পাঁচ দিনজুড়ে বৃষ্টির আভাস

বাসের ধাক্কায় হোটেল শ্রমিক নিহত

দাউদকান্দিতে ভ্রমণবাস খাদে, মেডিকেল শিক্ষার্থী আহত ২০

অক্টোবরে ফের চালু হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগ

International tourism fair to be held in Dhaka with participation from 20 countries

২০ দেশের অংশগ্রহণে ঢাকায় বসছে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা

ডিএসসিসিতে মশক নিয়ন্ত্রণে জোর, ৬০% বাসায় মিলেছে লার্ভা

ভাঙ্গায় বাসের নিচে চাপা পড়ে মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত

ক্ষুদ্র মোড়ক, বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি: সতর্কীকরণ লেবেল কেন জরুরি