
তামাকজাত দ্রব্যে সুনির্দিষ্ট করারোপের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। কারণ তামাকজাত দ্রব্যে শ্রীলঙ্কা সুনির্দিষ্ট করারোপ করে রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও ইতিবাচক ফল পেয়েছে। বাংলাদেশ সিগারেটে ৮৩ শতাংশ কর হার নির্ধারণের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় কর হারে শীর্ষে হলেও শ্রীলঙ্কায় কর হার ৬৮ শতাংশ। কিন্তু সিগারেটের সহজলভ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেট প্রায় সাত গুণ বেশি সহজলভ্য। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার তামাক কর কাঠামো অনুসরণীয়।
আজ মঙ্গলবার (১৫ আগস্ট ২০২৬) সকালে “অ্যাডভান্সিং টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি অ্যান্ড প্রাইস মেজারস: লেসনস ফ্রম শ্রীলঙ্কা” শীর্ষক একটি ওয়েবিনারের শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের তামাক কর বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) এবং শ্রীলঙ্কার টেক টার্ন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন, শ্রীলঙ্কার ভেরিতে রিসার্চের (Verité Research) প্রধান অর্থনীতিবিদ রাজ প্রভু রাজাকুলেন্দ্রন ও শ্রীলঙ্কার টেক টার্ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক আসিথা ধর্শনা ফনসেকা। ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ভেরিতে রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক ড. নিশান দে মেল, টেক টার্ন ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম পরিচালক সামিরা লাকমাল ও ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের বাংলাদেশের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম। ওয়েবিনারটির সঞ্চালনা করেন বিইআরের গবেষণা সহযোগী মিসেস ইশরাত জাহান ঐশী।
ওয়েবিনারে প্রফেসর ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদ বলেন, তামাক খাত থেকে মোট রাজস্বের প্রায় ১০ শতাংশ আয় হওয়ায় বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের কর ব্যবস্থার অনেক সমস্যাই কাঠামোগত। সিগারেটের চারটি স্তর, বিড়ির দুটি স্তর এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের কর ব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে। অ্যাড ভ্যালোরেম কর পদ্ধতি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং কর প্রশাসনও দুর্বল। শ্রীলঙ্কার সাথে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় আমাদের এই কাঠামোগত ও প্রশাসনিক বাধাগুলো মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
রাজ প্রভু রাজাকুলেন্দ্রন বলেন, শ্রীলঙ্কায় সরকার রাজস্ব বৃদ্ধিতে সিগারেটের ওপর ধার্যকৃত করের ৭০ শতাংশই সিগারেটের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কর নির্ধারণ করেছে এর সঙ্গে আলাদাভাবে ভ্যাটও আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে সরকার সরাসরি খুচরা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের কর কাঠামো সম্পূর্ণভাবে অ্যাড ভ্যালোরেম। ফলে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কার্যত উৎপাদকদের হাতেই থেকে যায়। ফলে বাংলাদেশেও রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য অ্যাড ভ্যালোরেমের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট করারোপ ইতিবাচক হবে।
তিনি আরও বলেন, আয় বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে সুনির্দিষ্ট কর নিয়মিত সমন্বয় করা প্রয়োজন হয়। অস্ট্রেলিয়ার মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অথবা নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও করা যেতে পারে। অন্যদিকে কর বৃদ্ধি করলে রাজস্ব কমে যায় এটাও ঠিক না। কারণ ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কা যখন সুনির্দিষ্ট করারোপ করে তখন সিগারেটের কর প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের কর রাজস্ব বৃদ্ধি পায় প্রায় ৫০ শতাংশ।
ড. নিশান দে মেল বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে মূল্যই থাকুক না কেন, আপনাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তত ছয় গুণ মূল্যবৃদ্ধি করা। কোম্পানি নিজেই যে মূল্য নির্ধারণ করে তা থেকে এই লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। সুনির্দিষ্ট কর টাকার অঙ্কে নির্ধারণ করতে হবে। প্রতি সিগারেটে ১৫ টাকা হতে পারে। আর বাকিটা অন্যান্য মূল্যভিত্তিক কর ব্যবস্থা অনুযায়ী থাকতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটা নিশ্চিত করা যে সুনির্দিষ্ট কর চালুর সময় অন্য কোনো কর পদ্ধতি তুলে নেওয়া যাবে না। তামাক কোম্পানি প্রায়ই প্রস্তাব দিতে পারে বিদ্যমান শতাংশভিত্তিক শুল্কের বদলে সুনির্দিষ্ট কর বসানো। অন্য সব কর অপরিবর্তিত থাকবে আর সুনির্দিষ্ট করকে একটি বাড়তি কর হিসেবে যুক্ত করুন। তাহলে জনস্বাস্থ্য রাজস্ব বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
আসিথা ধর্শনা ফনসেকা বলেন, তামাক কর বাড়ালে নাগরিকদের বিদ্যুৎ ও মোবাইল ডেটার ওপর প্রস্তাবিত করবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অন্য কোথাও বাড়তি বোঝা থেকেও মুক্তি দেয়া সম্ভব। একইসঙ্গে এই অর্থ জনস্বাস্থ্যেও ব্যয় করা সম্ভব হবে।
সামিরা লাকমাল বলেন, শ্রীলঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগগুলো কখনো কখনো তামাক কোম্পানির বক্তব্যকেই জোরালো করেছে। ফলে বাংলাদেশকে তামাক কর বিষয়ে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট করারোপের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা কীভাবে এভিডেন্স তৈরি করেছে, কীভাবে তা নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করেছে সেটা সত্যিই বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয়। আশা করছি বাংলাদেশও জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাকজাত দ্রব্যে অ্যাডভেলরেমের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট করের প্রচলন করবে।
ওয়েবিনারের সমাপনী বক্তব্যে বিইআর-এর প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম বলেন, আমরা ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই। এটি অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্য, কিন্তু আমাদের তা অর্জন করতেই হবে। আমরা যদি একসাথে কাজ করি, আর শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে শেখা শিক্ষাগুলো কাজে লাগাই, তাহলে এই লড়াই আমাদের জন্য সহজ হবে।
ওয়েবিনারে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবীদ, তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও সাংবাদিকসহ দেশের বিভিন্ন তামাক বিরোধী সংগঠনের ৭০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।