
দেশের বস্ত্রশিল্পের কাঁচা তুলার চাহিদা মেটাতে ২০৫০ সালের মধ্যে স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে ১৯ লাখ বেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে তুলা চাষের জমি বাড়িয়ে দুই লাখ হেক্টরে উন্নীত করার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১৬ লাখ বেল তুলার চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে বলে জানিয়েছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড (সিডিবি)। তবে বস্ত্রশিল্পের ব্যাপক চাহিদার হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে শিল্পের প্রয়োজনের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। এ শিল্পে বছরে আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল তুলা প্রয়োজন।
সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন বলেন, দেশের ৫০টিরও বেশি জেলায় তুলার উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ বেল, ২০৪০ সালের মধ্যে ১০ লাখ বেল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল আঁশতুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য তুলা চাষের জমি বাড়িয়ে দুই লাখ হেক্টরে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার ও নীলফামারী জেলায় তুলা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে।
বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলার ১৩২টি উপজেলায় উফশী ও পাহাড়ি জাতের তুলা চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৯ শতাংশ জমিতে উফশী এবং ৩১ শতাংশ জমিতে পাহাড়ি তুলা চাষ করা হয়। প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করে বছরে প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার বেল আঁশতুলা উৎপাদিত হচ্ছে।
তুলা উৎপাদন বাড়াতে উঁচু চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল, উপযোগী পাহাড়ি জমি, কম উর্বর ও কম উৎপাদনশীল জমি, লবণাক্ততা ও খরাপ্রবণ এলাকা এবং সরকারি খাসজমি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ফলের বাগান ও সবজি, ডাল ও মসলার সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবে তুলা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতবিনিময় সভায় দেশের তুলা উৎপাদনের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দিতে সিডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া গত ১৬ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম সভায় স্থানীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয় কমাতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
তুলা চাষে লাভের সম্ভাবনা
সিডিবির মৃত্তিকা পুষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, পাট চাষের বিস্তার কমে যাওয়ার পর তুলা দেশের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষকদের তুলা চাষে উৎসাহিত করা গেলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং কাঁচা তুলা আমদানির পরিমাণও কমবে।
সিডিবির বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, প্রতি বিঘা জমিতে তুলা চাষে আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে, ওই জমিতে প্রায় ১৫ মণ কাঁচা তুলা উৎপাদন করে একজন কৃষক প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।
সিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, দেশে প্রতি কেজি তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানি ব্যয়ের চার মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি তুলার বীজ বপন শুরু হয় এবং ডিসেম্বর মাসে ফসল সংগ্রহ করা হয়।
তুলা চাষের পরিবেশগত সুবিধা তুলে ধরে সিডিবির জ্যেষ্ঠ জিনিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক এবং মাটির উর্বরতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, একই জমিতে পরপর তিনবার ভুট্টা চাষ করলে মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
তুলা গবেষণা ও উৎপাদনে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা
দেশে তুলা গবেষণা ও চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগের ইতিহাস তুলে ধরে সিডিবির বিশেষজ্ঞরা জানান, স্বাধীনতার পরপরই তুলা উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে তুলা চাষ শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে রংপুর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উফশী জাতের ‘ডেল্টাপাইন-১৬’ তুলার চাষ সম্প্রসারণ করা হয়।
১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলাবীজ আমদানির পর তুলা গবেষণা ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে ‘কটন রিসার্চ সেন্টার অ্যান্ড সিড প্রোডাকশন ফার্ম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিডিবির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খামারের নাম পরিবর্তন করে ‘কটন রিসার্চ, ট্রেনিং অ্যান্ড সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্ম’ রাখেন। ১৯৯৪ সালে তিনি গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি তুলা খামার উদ্বোধন করেন।
বর্তমানে আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি সংযোজন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এসব খামারকে আধুনিক তুলা গবেষণা ও বীজ উৎপাদন ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, তুলাচাষিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং বিদেশ থেকে তুলা আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
জনবল সংকটে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ
তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সিডিবির মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিডিবি সূত্র জানায়, বোর্ডের অনুমোদিত ৮৬৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪৮৩ জন। ফলে ৩৮১টি পদ শূন্য রয়েছে।
এদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা ও সুতা আমদানিতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে দেশের বস্ত্রশিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলবে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।