ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৫ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

জলবায়ুর রোষে অস্তিত্ব সংকটে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩ সকাল

Link Copied!

বাগেরহাটের ‘মসজিদের শহর’ থেকে শুরু করে বগুড়ার মহাস্থানগড়—জলবায়ু পরিবর্তনের বিষাক্ত ছোবলে আজ বিপন্ন বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি ঐতিহাসিক মাটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লোনা পানির আগ্রাসন, অতিবৃষ্টি আর অনিয়মিত আবহাওয়ার মরণকামড়ে দেশের শত বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব কেবল স্থাপনার ওপরই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ইতিহাসের ওপর এক বিশাল হুমকির নাম। ইতিহাসের সাক্ষী এই স্থাপনাগুলো যেন এখন প্রকৃতির প্রতিশোধের শিকার।

বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ১০৬টি উপজেলায় ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর লবণাক্ত জমি রয়েছে। ২০২৬ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাগুলোতে লবণাক্ততা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৫ সাল থেকে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন আঘাত হানা ভয়াবহ সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মাটি ও পানিতে লবণের ঘনত্ব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

# উপকূলের ৫০টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মারাত্মক ঝুঁকিতে
# লোনা পানির আগ্রাসনে ইটের প্রাচীন কাঠামো হচ্ছে ভঙ্গুর
# নোনায় প্রত্নস্থাপনার নান্দনিক রূপ ও অখণ্ডতা নষ্ট হচ্ছে
# ষাট গম্বুজ মসজিদে বাড়ছে নোনা ধরা বা ইফ্লোরেসেন্স
# বর্ষায় পাহাড়পুর বিহারে বাড়ছে শ্যাওলা ও ছত্রাকের উপদ্রব
# মহাস্থানগড়ে থার্মাল স্ট্রেসের কারণে কাঠামোতে গভীর ফাটল
# লালমাই পাহাড়ের ঢাল ক্ষয়ে ধসের মুখে প্রাচীন স্তূপ

গবেষণার আলোকে ঝুঁকির মাত্রা:
ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর সর্বশেষ জলবায়ু ঝুঁকি সূচকেও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিবেশগত ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) স্থাপত্য ও পরিবেশ বিজ্ঞান, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি এবং আইকোমোস (আইসিওএমওএস)-এর যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা ১২৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে অন্তত ৫০টি বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, শিল্প দূষণ, মৌসুমি আর্দ্রতা এবং মাটির নিচের লবণাক্ততা এই প্রাচীন স্থাপত্যের অবক্ষয়ের হার ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে লোনা পানির আগ্রাসন কেবল মাটি নয়, বরং ইটের প্রাচীন কাঠামোকে রাসায়নিকভাবে ভঙ্গুর করে তুলছে, যা চলতি বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক সুরক্ষায় এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বার্ষিক জরিপও একই কথা বলছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। যা প্রাচীন ইটের তৈরি স্থাপনাগুলোর কাঠামোগত স্থায়িত্বের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, ক্রমবর্ধমান সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস এবং অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষের ফলে মাটি ও পানিতে লবণের ঘনত্ব বেড়েই চলেছে, যা প্রাচীন ইটের তৈরি স্থাপনাগুলোর স্থায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।

ষাট গম্বুজ মসজিদ (বাগেরহাট):
ইউনেস্কো স্বীকৃত এই ইসলামিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বহুমুখী হুমকির মুখে পড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা মসজিদের দেয়াল, মেহরাব, স্তম্ভ ও গম্বুজের মারাত্মক ক্ষতি করছে। বিশেষ করে মাটির নিচের লবণাক্ত পানি ইটের ভেতরে প্রবেশ করে লবণের স্ফটিক তৈরি করছে, যা ইটের বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে দেয়ালে ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়া এবং মেহরাবের নকশা মুছে যাওয়ার মতো ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুলনার সিডর ও আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো এই স্থাপনায় লবণাক্ত পানির ছিটা নিয়ে আসায় মেহরাবগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, স্থাপনার বালুময় পাথরের স্তম্ভ এবং মরিচা ধরা লোহার ক্ল্যাম্পগুলো মসজিদের ভার বহনের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শফিকুল আলম বলেন, গত কয়েক দশকে লবণের প্রভাবে মসজিদের ইটের স্থায়িত্ব অভাবনীয়ভাবে কমে গেছে। লোনা বাষ্প ইটের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভেতরেই স্ফটিক তৈরি করে, যা স্থাপত্যবিদ্যার ভাষায় ‘ইফ্লোরেসেন্স’ বা নোনা ধরা নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় ইটের উপরের স্তরটি ভেতর থেকে ঠেলে বের হয়ে আসছে এবং ইট ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে পড়ছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বিষয়টি আমলে নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। ইউনেস্কোর সহায়তায় মসজিদটির দেয়াল, গম্বুজ ও স্তম্ভের ক্ষয়ক্ষতির মানচিত্র তৈরি করে একটি সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদী পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এই উদ্যোগে স্থানীয় স্থপতি, প্রকৌশলী, রসায়নবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর আগে ২০১৯ সালে সাইআর্ক থ্রিডি লেজার স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে মসজিদটির ডিজিটাল নথিপত্র তৈরি করেছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্থাপনা রক্ষায় এখন প্রয়োজন আরও বিনিয়োগ, উন্নত সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং দেশের বিদ্যমান ঐতিহ্য সুরক্ষা আইনের আধুনিকায়ন।

চুনাখোলা মসজিদ (বাগেরহাট):
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক চুনাখোলা মসজিদটি বর্তমানে লবণের সাদা প্রলেপে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, যা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্থাপনাটির গম্বুজ ও দেয়ালগুলোতে যে পরিমাণ নোনা ধরেছে, তাতে এর মূল কাঠামোগত অখণ্ডতা আজ প্রশ্নের মুখে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপকূলের লোনা পানির উচ্চতা বাড়ার ফলে ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি ইটের গাঁথুনির মাধ্যমে উপরে উঠে আসছে, যা মসজিদের গম্বুজ ও দেয়ালের জোড়াগুলোকে আলগা করে দিচ্ছে। অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লবণের এই রাসায়নিক বিক্রিয়া ইটের উপাদানের সাথে মিশে তাকে নরম ও ভঙ্গুর করে তুলছে। নিয়মিত সংস্কারের পরেও এই লবণের আগ্রাসন থামানো যাচ্ছে না, ফলে চুনাখোলা মসজিদটি অদূর ভবিষ্যতে ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার (নওগাঁ):
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘায়িত বর্ষা মৌসুম এবং বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্ষা দীর্ঘ হওয়ায় দেয়ালের ইটের গাঁথুনিতে শ্যাওলা ও ছত্রাকের প্রলেপ দ্রুত বাড়ছে, যা ইটের উপাদানকে ভেতর থেকে পচিয়ে ফেলছে। এই আর্দ্রতা স্থাপনার মূল ভিত্তিমূল পর্যন্ত পৌঁছে ইটকে নরম করে দিচ্ছে, ফলে বিহারের দেয়ালগুলো পূর্বের ন্যায় চাপ সহ্য করতে পারছে না। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখানকার স্থানীয় বাস্তুসংস্থানের যে পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে মাটির আর্দ্রতা ধারণ ক্ষমতাও বদলে গেছে। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা বিহারের ইটের অকাল ক্ষয় ত্বরান্বিত করছে এবং স্থাপনাটিকে স্থায়ী ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা বিশ্ব ঐতিহ্যের মানদণ্ড রক্ষায় এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

মহাস্থানগড় (বগুড়া):
বগুড়ার মহাস্থানগড় বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনগুলোর একটি। তবে বর্তমানে করতোয়া নদীর পরিবর্তিত গতিপথ ও অতিবৃষ্টির কারণে এই বিশ্ব ঐতিহ্য এখন ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষাকালে করতোয়া নদীতে বন্যার মাত্রা ও তীব্রতা বহুগুণ বেড়েছে, যা স্থাপনাটির চারপাশের মাটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির গভীরে থাকা হাজার বছরের পুরোনো ইটের গাঁথুনিগুলো অত্যধিক আর্দ্রতার কারণে নিয়মিত সংকুচিত ও প্রসারিত হচ্ছে। এই ‘থার্মাল স্ট্রেস’ বা তাপীয় চাপের ফলে প্রাচীন কাঠামোর ভেতর গভীর ফাটল দেখা দিচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বার্ষিক জরিপ অনুযায়ী, ভূমির এই অস্বাভাবিক নড়াচড়া ও পানির স্তরের পরিবর্তনের কারণে স্থাপনাটির প্রাচীন ঢিবিগুলো এখন ধসে পড়ার চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জরুরি সুরক্ষাব্যবস্থা ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম ছাড়া এই অমূল্য ঐতিহ্যকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ময়নামতী (কুমিল্লা):
কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আজ প্রকৃতির রোষানলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক ও তীব্র বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ের নরম মাটি ধসে পড়ছে, যা হুমকির মুখে ফেলেছে প্রাচীন বিহার ও স্তূপগুলোকে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, আগের তুলনায় বর্তমানের বৃষ্টিপাত অনেক বেশি ঘন ও প্রচণ্ড। এই বৃষ্টির তোড়ে পাহাড়ের ঢাল দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে, ফলে আলগা হয়ে পড়ছে প্রাচীন স্থাপত্যের চারপাশের মাটির স্তর। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সতর্ক করে বলছেন, মাটি ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে শত বছরের পুরোনো এই স্তূপগুলোর ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন আলগা হয়ে গেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ধসের কারণ হতে পারে।

এই ঝুঁকি এড়াতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পাহাড়ের ঢালে পরিকল্পিত বনায়ন প্রকল্পের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির স্বাভাবিক গঠন ও সুরক্ষা নিশ্চিত না করা গেলে লালমাইয়ের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা অদূর ভবিষ্যতে অসম্ভব হয়ে পড়বে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ:
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকৌশলী খোন্দকার জাহিদুল করিমের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আর অবহেলার সুযোগ নেই। মাটির লবণাক্ততা ও পানির স্তরের পরিবর্তনের ফলে হাজার বছরের পুরোনো ইটের গাঁথুনি এখন অনেকটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। অধিদপ্তরের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ বলছে, আগেকার সংস্কারের তুলনায় এখন প্রতি বছর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, যা নির্দেশ করে যে স্থাপনাগুলো প্রকৃতির সাথে আর তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে পারছে না। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর দেয়ালে নোনা পানির কারণে যে ‘লবণাক্ততা’ তৈরি হয়েছে, তা ভবনগুলোর ভিত্তিমূলকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করছে।

ইউনেস্কোর বার্তা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ:
ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক কাউন্সিল অন মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস (আইসিওএমওএস) সতর্ক করেছে যে, বাগেরহাটসহ দেশের অন্যান্য বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ‘প্রত্নতাত্ত্বিক দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। ইউনেস্কো স্পষ্ট করেছে যে, এই স্থাপনাগুলো কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এগুলো সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাস। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং জলবায়ু-সহিষ্ণু প্রযুক্তি ব্যবহার না করা হলে এই স্থাপনাগুলোর কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে অটুট রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত:
এই স্থাপনাগুলো কেবল ইট-পাথর বাঁচানো নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের আত্মাকে রক্ষা করার লড়াই বলে মন্তব্য করেছেন ড. মো. শফিকুল আলম। ইউথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান ‘নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এর ওপর জোর দিয়ে বলেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি একটি জাতির পরিচয়, স্মৃতি এবং সামাজিক বন্ধনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, যা টাকার অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়।

খুবি স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার মাহফুজ উদ দারাইন, যিনি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গবেষণায় যুক্ত, তিনি বলেছেন, ‘সনাতন পদ্ধতিতে এই ঐতিহ্য রক্ষা সম্ভব নয়। আমাদের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ‘ড্যাম্প-প্রুফিং’ প্রযুক্তি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা হ্রাসে সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আরও জানান, প্রত্নতত্ত্ববিদরা এখন প্রতিটি স্থাপনার জন্য আলাদা ‘ক্লাইমেট-রিসিলিয়েন্ট কনজারভেশন প্ল্যান’ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
ঐতিহ্য রক্ষায় বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলো হলো- কেবল উপকূলীয় অঞ্চল নয়, পুরো দেশের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর জন্য একটি জলবায়ু-সহিষ্ণু মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা, যেখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ করবে। সংস্কার কাজে এমন উন্নত রাসায়নিক ও আধুনিক ‘ড্যাম্প-প্রুফ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যা স্থাপনাকে আর্দ্রতা ও লবণ থেকে রক্ষা করতে পারে। মহাস্থানগড় বা ময়নামতীর মতো স্থানগুলোতে প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পাহাড়ের ঢাল সুরক্ষায় স্থানীয় বাস্তুসংস্থান রক্ষা করা। পুরাকীর্তি এলাকার চারপাশে শিল্পায়ন ও অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণ আইনত কঠোরভাবে বন্ধ করা। ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও তহবিল কাজে লাগিয়ে স্থাপনাগুলোকে ‘মডেল প্রোটেকশন জোন’ হিসেবে গড়ে তোলা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়তে পারে অর্থনৈতিক চাপ: পরিবেশমন্ত্রী

বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত, শিশুসহ ৬ আরোহী নিহত

ইসরায়েলগামী বিমানে বাংলাদেশের পাইলটদের নিষিদ্ধ করল এয়ার ফ্রান্স!

তিন বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা, কমতে পারে রাতের তাপমাত্রা

বিমানবন্দর ও রেলপথে চোরাচালান, কোটি টাকার পণ্য জব্দ

আদাবরে স্বল্প পরিসরে সবুজায়ন কর্মসূচি

স্বাস্থ্যসচেতনতা ও মূল্যস্ফীতিতে ৫ বছরে চিনির ব্যবহার কমেছে ৩৩%

চলতি মাসেই কমলাপুরসহ চার স্টেশনে মেট্রোরেলের ইউটিলিটি স্থানান্তর শুরু

২০৫০ সালের মধ্যে তুলা উৎপাদন ১৯ লাখ বেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের

জলবায়ুর রোষে অস্তিত্ব সংকটে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন