
একই মাঠে চাষ হচ্ছে ৫২ জাতের আমন ধান। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা ধানের গাছ দেখে জাতভেদে বৈশিষ্ট্য বুঝছেন কৃষকেরা। উপযোগী জাত নির্বাচন ও উন্নত ধান চাষে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্যোগে দিনাজপুর সদর উপজেলার হুগলীপাড়া গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যতিক্রমী এই ‘রাইস গার্ডেন’। এর মাধ্যমে গ্রামটি স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছে ‘প্রযুক্তিগ্রাম’ নামে।
দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশের হুগলীপাড়া গ্রামে চলতি আমন মৌসুমে এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে এবং ব্রির দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এ রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে। মাঠের বিভিন্ন অংশে সারি সারি করে চাষ করা হয়েছে ৫২ জাতের আমন ধান। প্রতিটি জাতের জমিতে নাম ও পরিচিতিসংবলিত সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য উন্নত ও উচ্চফলনশীল ধানের জাত এবং আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দেওয়া। মাঠে বিভিন্ন জাতের গাছের উচ্চতা, বৃদ্ধি, শীষের গঠন, রোগবালাই সহনশীলতা, ফলনক্ষমতা ও গুণগত বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে কৃষকেরা নিজেদের জমির উপযোগী জাত বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
রাইস গার্ডেন পরিদর্শনের পাশাপাশি কৃষকেরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরামর্শ, বীজ সরবরাহ ও জমি প্রস্তুতিতে সহযোগিতা পাচ্ছেন। এতে নতুন জাতের ধান চাষে তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে।
ব্রি সূত্রে জানা গেছে, প্রদর্শনীতে বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-৫, বিআর-১০, বিআর-১১, বিআর-২২, বিআর-২৩ ও বিআর-২৫-সহ ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের ধান রয়েছে। এর মধ্যে ব্রি ধান-৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪৪, ৪৬, ৪৯, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৬, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৫, ৭৬, ৭৭, ৭৮, ৭৯, ৮০, ৮৭, ৯০, ৯১, ৯৩, ৯৪, ৯৫, ১০৩, ১০৯, ১১০ ও ১১১ এবং ১১২ নম্বর জাত রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ব্রি হাইব্রিড ধান-৪ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-৬।
কৃষক আবু সাঈদ বলেন, ব্রির উদ্যোগে ধান চাষ সম্পর্কে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হচ্ছে। বীজ ও সারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা পাচ্ছেন তাঁরা। এবার তিনি জিরা-৩৪, কাঠারি ও জিরা-৯০ জাতের ধান চাষ করেছেন। প্রদর্শনী মাঠে বিভিন্ন জাতের ধান দেখে আগামীতে ব্রি উদ্ভাবিত কোনো জাত চাষের পরিকল্পনা করছেন।
তরুণ কৃষক রাকিব বাবু বলেন, আগে দেশে কী কী জাতের ধান চাষ হয়, কোন জাত কত দিনে পরিপক্ব হয় এবং কীভাবে চাষ করতে হয়, সে বিষয়ে তাঁদের ধারণা সীমিত ছিল। এখন মাঠে সরাসরি বিভিন্ন জাত দেখে শেখার সুযোগ হচ্ছে। এতে আগামী মৌসুমে নিজের জমির জন্য উপযোগী জাত নির্বাচন সহজ হবে।
কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, প্রদর্শনী মাঠ দেখে এলাকার অনেক কৃষক ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এখনো ধানের শীষ বের হয়নি, তবে গাছের বৃদ্ধি ও অবস্থা দেখে বিভিন্ন জাত সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। যেসব জাতের ফলন ভালো হবে, আগামীতে সেগুলো চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্রির দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ জাহিদ হাসান বলেন, ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো মানে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়। অল্প জমিতে পরিমিত পানি ব্যবহার, মানসম্মত বীজ প্রয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ধারাবাহিক উৎপাদনশীলতা বজায় রাখাই প্রকৃত লক্ষ্য। এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৫টি প্রযুক্তিগ্রামের কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ চলছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাত ও আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পটির পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের ১৫টি গ্রামকে আদর্শ প্রযুক্তিগ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি পরিস্থিতি বিবেচনায় উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপ্রযুক্তি উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ব্রি-১১৬, ব্রি-১১৭ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ অবমুক্ত করা হয়েছে। ব্রি-১১৭ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ লবণাক্ততা সহনশীল। এ ছাড়া ব্রি-১১৮ নামে একটি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, যা হাওর অঞ্চলে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ চলছে। আগাম রোপণ ও আগাম কাটার উপযোগী এ জাতটি আগাম বন্যায় ফসলহানির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় উদ্ভাবিত অন্যান্য জাত ও প্রযুক্তিও কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।