ঢাকাবুধবার , ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

স্ট্রোকে দ্রুত চিকিৎসা কমাতে পারে পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুঝুঁকি

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ অক্টোবর ২০২৬, ৫:৪৬ বিকাল

Link Copied!

স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের আশঙ্কা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রোগের লক্ষণ শনাক্ত করা, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো এবং উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

স্ট্রোক একটি গুরুতর মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ এই রোগ। বাংলাদেশেও স্ট্রোক একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ:

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি, ধূমপান, স্থূলতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এবং কিছু হৃদ্‌রোগও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

বর্তমান সময়ের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস পরোক্ষভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সুস্থ জীবনযাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ স্ট্রোক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্ট্রোকের লক্ষণ চিনতে মনে রাখুন ‘BE FAST’

সাধারণ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করার জন্য ‘BE FAST’ একটি সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি।

B — Balance (ভারসাম্য): হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, হাঁটতে অসুবিধা বা মাথা ঘোরা।

E — Eyes (চোখ): হঠাৎ ঝাপসা দেখা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা এক বা দুই চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া।

F — Face (মুখ): মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া বা হাসতে বললে দুই পাশের মধ্যে অসমতা দেখা দেওয়া।

A — Arms (হাত): এক হাত বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা অবশ অনুভূত হওয়া।

S — Speech (কথা): কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা হওয়া অথবা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া।

T — Time (সময়): এসব লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলেই সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সময়টি মনে রাখতে হবে এবং রোগীকে দ্রুত এমন হাসপাতালে নিতে হবে, যেখানে জরুরি মস্তিষ্কের ইমেজিং ও স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। লক্ষণ সাময়িকভাবে সেরে গেলেও চিকিৎসা নিতে হবে।

প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণ শুরু হওয়ার সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে শিরাপথে রক্তের জমাট ভাঙার ওষুধ প্রয়োগ করা যায়। এই চিকিৎসাকে বলা হয় ইন্ট্রাভেনাস থ্রম্বোলাইসিস (IV Thrombolysis)।

সঠিক সময়ে এবং যথাযথভাবে এই চিকিৎসা দেওয়া গেলে অনেক রোগীর স্নায়বিক অক্ষমতা কমানো সম্ভব। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বড় রক্তনালিতে জমাট অপসারণের জন্য মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি (Mechanical Thrombectomy) করা হয়। নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ইমেজিংয়ের ভিত্তিতে লক্ষণ শুরুর ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত এই চিকিৎসা বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে সাড়ে চার ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তত বাড়তে পারে। চিকিৎসা শুরুর আগে মস্তিষ্কের স্ক্যানসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে স্ট্রোকের ধরন নির্ণয় করা জরুরি, কারণ রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসা ভিন্ন।

‘টাইম ইজ ব্রেন’: সময় নষ্ট হলে ক্ষতি বাড়ে

স্ট্রোকের চিকিৎসায় ‘টাইম ইজ ব্রেন’ একটি বহুল ব্যবহৃত ধারণা। এর অর্থ হলো, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ফলে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে স্থায়ী পঙ্গুত্ব, কথা বলার ক্ষমতা হারানো, চলাফেরায় অক্ষমতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

এবারের বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে ‘Every Minute Counts’ বা ‘প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ’ বার্তাটি স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। এই বার্তার মূল শিক্ষা হলো—স্ট্রোকের লক্ষণ শনাক্ত করা থেকে শুরু করে হাসপাতালে পৌঁছানো এবং চিকিৎসা শুরু করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সময় বাঁচাতে হবে।

স্ট্রোক প্রতিরোধে সচেতন জীবনযাপন জরুরি

স্ট্রোকের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এড়ানো সম্ভব। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা, ধূমপান পরিহার এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি ও ফলমূলের পরিমাণ বাড়াতে হবে। অতিরিক্ত লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে। লাল মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে স্ট্রোক চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন

বাংলাদেশে স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি জরুরি রোগী পরিবহন, দ্রুত রোগ নির্ণয়, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং পুনর্বাসনসেবা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। ঢাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্ট্রোকের চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রেও এ ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে সব হাসপাতালে সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসা সমানভাবে উপলব্ধ নয়। তাই রোগীকে নেওয়ার আগে সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের জরুরি স্ট্রোক চিকিৎসা, থ্রম্বোলাইসিস ও থ্রম্বেকটমির সুবিধা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনে উপযুক্ত কেন্দ্রে স্থানান্তরের ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সচেতনতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সময়মতো আধুনিক চিকিৎসাই পারে অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা সম্প্রসারণ

বাংলাদেশে স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঢাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্ট্রোকের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পাশাপাশি পপুলার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসাসেবা, বিশেষায়িত স্ট্রোক কেয়ার সেন্টার রয়েছে।

স্ট্রোকের রোগীদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত রোগী নির্বাচনের পর শিরাপথে রক্তের জমাট ভাঙার ওষুধ প্রয়োগ, অর্থাৎ ইন্ট্রাভেনাস থ্রম্বোলাইসিস (IV Thrombolysis), এবং নির্দিষ্ট রোগীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বড় রক্তনালি থেকে জমাট অপসারণের চিকিৎসা, অর্থাৎ মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি (Mechanical Thrombectomy), অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব চিকিৎসা যথাসময়ে নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগীর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

(ডা উজ্জ্বল কুমার মল্লিক, সহকারী অধ্যাপক, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল)

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন