
ত্বকের মারাত্মক ক্যানসার ‘মেলানোমা’র চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না এবং মার্ক। সম্প্রতি প্রকাশিত ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের পর মেলানোমায় আক্রান্ত রোগীদের শরীরে মডার্নার কাস্টমাইজড বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক এমআরএনএ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসা কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘ইন্টিসমেরান’ নামের এই ভ্যাকসিনটি অনুমোদিত হলে তা হবে ক্যানসার চিকিৎসায় বিশ্বের প্রথম সফল এমআরএনএ ভ্যাকসিন।
সাধারণত ক্যানসার চিকিৎসায় কোনো নতুন পদ্ধতি বা ওষুধে ১০ শতাংশ ঝুঁকি কমানোকেই একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে গণ্য করা হয়। সেখানে ৪২ শতাংশ ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিকে ক্যানসার গবেষকেরা অবিশ্বাস্য সাফল্য হিসেবে দেখছেন। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের ম্যাটার রিসার্চের ইমিউনোথেরাপিস্ট ক্রিস্টেন র্যা ডফোর্ড এবং কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতত্ত্ববিদ সেথ চিথাম জানান, এ ধরনের ফলাফল ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
টিকাটি মূলত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রতিরোধে ব্যবহৃত হবে না। এটি তৈরি করা হয়েছে এমন মেলানোমা রোগীদের জন্য, যাদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ইতিমধ্যে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে কিন্তু শরীরে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে এবং যারা কেবল প্রচলিত ইমিউনোথেরাপিতে পুরোপুরি কাজ পাচ্ছেন না।
মেলানোমা ইনস্টিটিউট অফ অস্ট্রেলিয়ার অনকোলজিস্ট জিওরজিনা লংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই ট্রায়ালে বিশ্বজুড়ে ১৫৭টি সেন্টারের ১ হাজার ১৩৭ জন মাঝারি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মেলানোমা রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোগীদের দুই ভাগে ভাগ করে এক দলকে প্রচলিত ইমিউনোথেরাপি ওষুধ ‘পেমব্রোলিজুমাব’-এর সঙ্গে কাস্টমাইজড এমআরএনএ ভ্যাকসিন দেওয়া হয় এবং অন্য দলকে ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে প্লেসিবো দেওয়া হয়।
প্রায় ২৫ মাস ধরে তাদের পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সমন্বিত থেরাপি গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমে গেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই চিকিৎসায় কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
এই এমআরএনএ ভ্যাকসিন তৈরির প্রযুক্তিটি বেশ জটিল ও অভিনব। প্রথমে প্রতিটি রোগীর টিউমার টিস্যু থেকে ডিএনএ ও আরএনএ সিকোয়েন্সিং করে তাদের ক্যানসার কোশের নিজস্ব পরিবর্তন (মিউটেশন) চিহ্নিত করা হয়। এসব মিউটেশন থেকে ‘নিওঅ্যান্টিজেন’ নামক বিশেষ প্রোটিন তৈরি হয়, যা সুস্থ কোশ থেকে ক্যানসার কোশকে আলাদা করে। এরপর প্রতিটি রোগীর একক টিউমারের ওপর ভিত্তি করে এই টিকা তৈরি করা হয়। টিকাটি শরীরে প্রবেশ করে ইমিউন সিস্টেম বা অনাক্রম্যতা ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করে তোলে, যাতে তা সুনির্দিষ্টভাবে ক্যানসার কোশগুলোকে চিনে ধ্বংস করতে পারে।
তবে এই পার্সোনালাইজড ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে কিছু বড় ধরনের কারিগরি ও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদাভাবে ভ্যাকসিন তৈরি করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
এছাড়া পর্যাপ্ত ও মানসম্মত টিউমার টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করাও এক বড় জটিলতা তৈরি করেছে। ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠিয়ে কাস্টমাইজড ভ্যাকসিন তৈরি করে রোগীর কাছে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যায়। ট্রায়াল চলাকালে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ল্যাব থেকে ভ্যাকসিন প্রস্তুত হয়ে আসার আগেই তাদের শরীরে ক্যানসার ফিরে এসেছে।
পাশাপাশি সিডনির সেন্টেনারি ইনস্টিটিউটের ক্যানসার জিনতত্ত্ববিদ জেসামি টিফেন সতর্ক করে জানান, ক্যানসার কোশের দ্রুত রূপ বদলানোর ক্ষমতা থাকে। ফলে ২ বছর বা দীর্ঘমেয়াদে এই ভ্যাকসিন কতটা স্থায়ী প্রভাব রাখবে, তা দেখতে আরও সময়ের প্রয়োজন। তবুও ক্যানসার মোকাবিলায় এই এমআরএনএ ভ্যাকসিন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাবে বলে আশা করছেন বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা।