
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে গত বছর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে প্রকাশিত ডব্লিউএমও-এর সর্বশেষ ‘গ্রিনহাউস গ্যাস বুলেটিন’-এ এই আশঙ্কাজনক তথ্য তুলে ধরা হয়।
ডব্লিউএমও-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের বার্ষিক গড় ঘনত্ব দাঁড়িয়েছে ৪২৬.৮ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)। এটি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের (১৭৫০ সাল) ভিত্তিমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৫৩ শতাংশ বেশি। ২০০৪ সালে যখন প্রথম এই বুলেটিন প্রকাশ শুরু হয়, তখন বায়ুমণ্ডলে কার্বনের গড় ঘনত্ব ছিল ৩৭৭.৫ পিপিএম।
জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএমও-এর উপ-মহাসচিব কো ব্যারেট বলেন, ‘বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রতি এক পিপিএম বৃদ্ধিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অতিরিক্ত তাপ ধরে রাখে। এটি মূলত আমাদের মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলকে অতিমাত্রায় উত্তপ্ত করে তুলছে। এর ফলে দাবদাহ, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় এবং প্রবল বৃষ্টিপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আমাদের ধারণার চেয়েও দ্রুত এবং তীব্র গতিতে ভয়াবহ হয়ে উঠছে।’
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘গত ১১ বছর ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর এবং এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘ সময় টিকে থাকে। ফলে এর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল কয়েক বছর নয়, বরং কয়েক দশক কিংবা শতাব্দীজুড়ে বিশ্ব জলবায়ুকে প্রভাবিত করবে।’
শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইডই নয়, মানবসৃষ্ট দ্বিতীয় ও তৃতীয় শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘস্থায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস—মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের মাত্রাও ২০২৫ সালে নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির হার তিনগুণ বেড়েছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের দশকে যেখানে বছরে গড়ে ২.৪ পিপিএম করে কার্বন বাড়ত, সেখানে ২০২৩-২০২৪ সময়ে শক্তিশালী ‘এল নিনো’ আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে এই বৃদ্ধি রেকর্ড ৩.৫ পিপিএমে পৌঁছায়।
ইউএস ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) সূচক অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে জলবায়ুতে উষ্ণতার প্রভাব শতকরা ৫৬ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ৮১ শতাংশেরই মূল কারণ কার্বন ডাই-অক্সাইড।
বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে সবুজ জ্বালানির (ডিকার্বনাইজেশন) দিকে রূপান্তরের মধ্যে ডব্লিউএমও দুটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত ক্ষতিকর গ্যাসের ব্যাপারে সতর্ক করেছে। গ্যাস দুটি হলো—মলিকুলার হাইড্রোজেন এবং সালফার হেক্সাফ্লোরাইড।
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ‘সালফার হেক্সাফ্লোরাইড’ বায়ুমণ্ডলে ১ হাজার বছরেরও বেশি সময় টিকে থাকে এবং উষ্ণতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে প্রায় ২৪ হাজার ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। ২০২৫ সালে এই গ্যাসের উপস্থিতিও রেকর্ড গড়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেনের ব্যবহার বাড়লেও এর গ্যাস লিক হওয়া বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের অপ্রত্যক্ষ প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে (কপ৩১) কৌশল নির্ধারণকারীদের বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওই সম্মেলনে দেশগুলোর জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হবে।