
খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শেখ সরদারপাড়া গ্রাম। রাতভর বৃষ্টির পর থেমেছে পানি, কিন্তু কাদা-পানিতে একাকার গ্রামীণ পথ। পিচ্ছিল পথ মেপে মেপে হেঁটে চলার পথে চোখে পড়ে একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর। ঘরের সামনে মাটির ঢিবির উপর বসানো পুরোনো একটি মাটির হাঁড়ি, চালের পাশে বাঁধা মরিচা ধরা টিন। সেই টিন থেকে চুইয়ে পড়া পানি হাঁড়ির ভেতরে জমছে।
ঘরের সামনেই ৭০ বছরের ছবিরন বেগম হাঁড়ি থেকে পানি তুলে বালতিতে ঢালছেন। তার পুত্রবধূ ফজিলা খাতুন জানালেন, “খাওয়ার পানির বড় কষ্ট। বৃষ্টি হলেই এই পানি জমাই, এইটাই খাই। গোসল করি নদীর লোনাপানিতে। আর বৃষ্টি না থাকলে দূরের পুকুরে নৌকা নিয়ে যাই খাওয়ার পানি আনতে।”
এ দৃশ্য শুধু এক বাড়ির নয়। পুরো শেখ সরদারপাড়া, এমনকি গোটা কয়রা উপজেলায় একই চিত্র। অনেকেই ঘরের সামনে পলিথিন ঝুলিয়ে, হাঁড়ি বা ড্রামে পানি জমাচ্ছেন। কেউ কেউ অস্থায়ী রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং পদ্ধতি বানিয়েছেন নিজ উদ্যোগে। এখানে জীবন মানেই শুধু অর্থ উপার্জনের যুদ্ধ নয়, মিঠা পানির জন্যও এক নিরব লড়াই।
মিঠাপানির তীব্র সংকট, লবণাক্ততায় বিপর্যস্ত জনজীবন
সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রার মহেশ্বরীপুর, বাগালী, আমাদি, মহারাজপুর ও সদর ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামে মিঠাপানির তীব্র সংকট বছরের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই থাকে। গভীর নলকূপ থাকলেও ওঠে লবণাক্ত পানি। একমাত্র ভরসা বৃষ্টির পানি আর দূরের কিছু মিষ্টি পানির পুকুর।
কয়রা নদীর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আসমা খাতুন বলেন, “এই নোনাপানিতেই রান্না, কাপড় ধোয়া সব করি। এখন তো বৃষ্টির পানি খাই, কিন্তু বর্ষা গেলে সেইটাও পাই না। গায়ের রংও কালচে হয়ে গেছে, আত্মীয়রা পর্যন্ত আর আসতে চায় না।”
নৌকাবাইচের পুরস্কারে খনন, ‘পুকুর’ হয়ে উঠেছে আশার প্রতীক
শেখ সরদারপাড়া গ্রামের আসাদুল ইসলাম জানান, গত বছর রূপসা নদীর নৌকাবাইচে গ্রামের কিছু যুবক বিজয়ী হয়ে পুরস্কারের অর্থে একটি মিষ্টি পানির পুকুর খনন করেন। এখন সেই পুকুরই গ্রামের বহু পরিবারের জন্য আশার আলো।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রকৃতির কাছে ফিরতে হবে
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, “সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রকৃতির দিকেই ফিরে যেতে হবে। বেশি করে পুকুর খনন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে একদিন এই সংকট কমবে।”
সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবতা
কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ জানান, “লবণাক্ততার কারণে গভীর নলকূপ থেকেও অনেক স্থানে মিঠাপানি মিলছে না। তাই ভূ-উপরিস্থ ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে।” তিনি জানান, সরকারিভাবে পানির ট্যাংক বিতরণ চলছে এবং বর্তমানে ৫৫ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি পাচ্ছেন। কেউ পানির ট্যাংক না পেলে আবেদন করলে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।