
হাসান মাহমুদ: চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সে এক যুগান্তকারী সাফল্য নিয়ে এসেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। টিস্যু বা জৈবিক নমুনাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করার এক অভিনব প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন শেনজেন ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড টেকনোলজি (এসআইএটি)-এর গবেষক দল। ‘ট্রান্সপারেন্ট এম্বেডিং সলভেন্ট সিস্টেম’ (টিইএসওএস) নামক এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন শরীরের যেকোনো অঙ্গকে কাঁচের মতো স্বচ্ছ করে তার ভেতরের গঠন নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। গত ১৯ জুন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার মেথডস’-এ গবেষণার এই ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

টিইএসওএস প্রযুক্তির উদ্ভাবনী কার্যপদ্ধতি:
সাধারণত শরীরের টিস্যুগুলো অস্বচ্ছ হওয়ায় মাইক্রোস্কোপের নিচে সেগুলোর ভেতরের সূক্ষ্ম গঠন দেখা অত্যন্ত কঠিন। বিদ্যমান প্রযুক্তিগুলো বড় নমুনা (যেমন পুরো মস্তিষ্ক) পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল না, কারণ নমুনাগুলো নমনীয় থাকায় সূক্ষ্ম কাটা বা ইমেজিং করা কঠিন হতো। নতুন এই পদ্ধতিতে গবেষকরা প্রথমে টিস্যু থেকে পানি এবং লিপিড অপসারণ করেন। এরপর সেগুলোকে একটি বিশেষ স্বচ্ছ দ্রবণে ডুবিয়ে এমন এক ধরনের রেজিনে স্থাপন করা হয়, যা টিস্যুকে অত্যন্ত মজবুত ও স্বচ্ছ করে তোলে।
প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই প্রযুক্তি ১৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম, যা টিস্যুর সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অংশগুলোকে বিকৃতি ছাড়াই স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়।

গবেষণার পেছনে যারা:
শেনজেন ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড টেকনোলজি (এসআইএটি)-এর গবেষক লু বিং এবং চেন শির নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী অত্যন্ত সফলভাবে ‘ট্রান্সপারেন্ট এম্বেডিং সলভেন্ট সিস্টেম’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস (সিএএস)-এর আওতাধীন এই প্রতিষ্ঠানের নিউরোসায়েন্স, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কম্পিউটার সায়েন্সের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে এই জটিল প্রকল্পটি সম্পন্ন করেছেন।
গবেষণায় মাইলফলক সাফল্য:
দীর্ঘ গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্রথম একটি ইঁদুরের সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের ৩০-ন্যানোমিটার রেজোলিউশনে থ্রিডি চিত্র ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এত বিশাল আকারের ইমেজ ডেটা প্রক্রিয়াজাত করা ছিল বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা সমাধানে গবেষকরা নতুন এক ডাটা-কম্প্রেশন অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন, যা বিশাল ডেটাকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিশ্লেষণে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে। ব্রেন ইমেজিং ল্যাবে তাঁদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন ও নির্ভরযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এখন খুব অল্প সময়ে এবং নিখুঁতভাবে পুরো মস্তিষ্কের স্নায়বিক নেটওয়ার্কের ম্যাপিং করা সম্ভব।

গবেষণাটির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে শেনজেন ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড টেকনোলজি (এসআইএটি)-এর অন্যতম প্রধান গবেষক লু বিং বলেন, ‘আমাদের উদ্ভাবিত এই ‘টিইএসওএস’ প্রযুক্তি কেবল একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া নয়, এটি জৈবিক টিস্যুর গঠন পর্যবেক্ষণে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। আগে টিস্যু কেটে পরীক্ষা করার সময় আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্নায়বিক সংযোগ হারিয়ে ফেলতাম, কিন্তু এখন কোনো অঙ্গকে না কেটেই এর ভেতরের প্রতিটি সূক্ষ্ম কাঠামো আমরা থ্রিডি ইমেজিংয়ের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে দেখতে পাচ্ছি। এটি নিউরোসায়েন্স গবেষণাকে আগামী দিনে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’
চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমূল পরিবর্তন:
বর্তমানে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য টিস্যুকে খুব পাতলা স্লাইস বা স্তরে কেটে পরীক্ষা করা হয়। এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হলো, এতে কোষের অনেক জটিল সংযোগ বা ত্রিমাত্রিক বিন্যাস হারিয়ে যায়, যা রোগের কারণ শনাক্তকরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কিন্তু ‘টিইএসওএস’ প্রযুক্তির মাধ্যমে টিস্যুকে না কেটেই পুরো অঙ্গকে স্বচ্ছ করে ত্রিমাত্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ করায় কোষের গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া সম্ভব। এটি ভবিষ্যতে নিউরোলজিক্যাল রোগ যেমন—আলঝেইমার, পার্কিনসনসহ বিভিন্ন টিউমার শনাক্তকরণ এবং ওষুধের কার্যকারিতা পর্যালোচনায় এক নতুন ও নির্ভুল ধারার সূচনা করবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও গুরুত্ব:
শেনজেন ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড টেকনোলজির গবেষকরা জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি কেবল গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ভবিষ্যতে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পুরো অঙ্গের ত্রিমাত্রিক চিত্র পাওয়ার ফলে চিকিৎসকরা কোষের বিন্যাস সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ ধারণা পাবেন, যা চিকিৎসা পদ্ধতিকে অনেক বেশি আধুনিক ও ব্যক্তিগতকৃত করবে।
আধুনিক প্রযুক্তির এই সংমিশ্রণ মানবদেহের জটিলতম রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীদের কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এটি আধুনিক প্যাথলজি ও বায়োমেডিক্যাল গবেষণাকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে জীবন রক্ষাকারী নতুন ওষুধ ও থেরাপি উদ্ভাবনে সহায়ক হবে।