
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতানুগতিক বা গৎবাঁধা পদ্ধতি পরিহার করে বাস্তবমুখী, টেকসই ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তিনি বলেছেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শুধু খাদ্যসামগ্রী বা ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং তাদের স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার মতো প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স ভবনের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনা সভা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বারবার বিভিন্ন অজুহাতে সময় বৃদ্ধি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই গুণগত মান বজায় রেখে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকল্প গ্রহণের আগে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে গৎবাঁধা পদ্ধতিতে প্রকল্প চালানো আর যাবে না। বরাদ্দ, মাস্টাররোল ও সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এমন প্রকল্প নিতে হবে, যাতে পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রার মানের বাস্তব পরিবর্তন আসে।”
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, তাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় সম্পদকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার এমন উন্নয়ন চায় যা মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনবে। এজন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সভায় প্রতিমন্ত্রী জানান, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য কমাতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ করা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সড়ক উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো সম্প্রসারণে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, পাহাড়ি এলাকার উন্নয়নের ভিত্তি হবে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে পর্যটনসহ অন্যান্য খাতও স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হবে।
১২ ঘণ্টায় খিয়াং পাড়ার সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ
সভায় প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলার দুর্গম **বড় কুক্যাছড়ি খিয়াং পাড়া**র বাসিন্দাদের দুর্ভোগ লাঘবে নেওয়া সাম্প্রতিক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি জানান, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন ওই পাহাড়ি জনপদে বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, নিরাপদ পানীয় পানি ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। কয়েক শ মানুষকে প্রতিদিন পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে পানি সংগ্রহ করতে হতো।
স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেন।
এ সময় খিয়াং পাড়ার বাসিন্দারা সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা করার দাবি জানান। প্রতিমন্ত্রী এসব দাবি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।