
নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় এক হাজার ৩৭৫ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগের ১০ দিন পরও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫ হাজার ৫৩১ জন। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৮৫০ জন বিদেশি নাগরিক।
শনিবার দুই দেশের সরকারি হিসাব থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
নেপালে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৩৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে এখনো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক।
অন্যদিকে, চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন। সেখানে আরও ৫৩১ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত করতে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৩২টি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
যেভাবে শুরু হয় ভয়াবহ দুর্যোগ
গত ২৬ আগস্ট মাউন্ট লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় বরফ ও পাথরের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে। এর ফলে ভয়াবহ তুষার ও পাথরের ধস নামে।
পরে সেই বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্তূপ দ্রুতগতির স্রোতে পরিণত হয়। স্রোতটি নেপাল-চীন সীমান্তের লেহেন্দে খোলা উপত্যকা দিয়ে তীব্র বেগে নিচে নেমে আসে।
এরপর চীনের তিব্বতের গিয়িরং সীমান্ত এলাকা হয়ে সেটি নেপালের ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। পথে বহু শহর ও গ্রাম বিশাল ঢেউয়ের পানিতে প্লাবিত হয়।
ধসের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে কয়েকটি প্রাকৃতিক বাঁধ ও জলাধার তৈরি হয়। পরে সেগুলো ভেঙে বা উপচে পড়ায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
বন্যায় নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও কাভ্রে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কাঠমান্ডু উপত্যকা ও আশপাশের এলাকাতেও।
অনেক গ্রাম মাটিচাপা পড়েছে কিংবা পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। ধ্বংস হয়েছে বহু ঘরবাড়ি, স্কুল, সেতু ও সড়ক। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
ত্রিশূলী ও ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থাপনায় শত শত শ্রমিক আটকা পড়েন। তাদের উদ্ধারে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালাতে হয়েছে।
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা কয়েকজনকে দুর্যোগের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যার স্রোতে মরদেহ ও ধ্বংসাবশেষ বহু দূর পর্যন্ত ভেসে গেছে। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরে কিছু মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এতে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনের গিয়িরং সীমান্ত চৌকিও কাদা ও ধ্বংসাবশেষে প্রায় চাপা পড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবন, যানবাহন ও অন্যান্য স্থাপনা।
চলছে উদ্ধার অভিযান
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। চীনের উদ্ধারকারী দলও এ কাজে যুক্ত হয়েছে।
বিধ্বস্ত এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক পরিষ্কার এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
তবে টানা বৃষ্টি, নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা, দুর্গম ভূখণ্ড এবং যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘ ও সহযোগী মানবিক সংস্থাগুলো নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা দিতে ৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলার তহবিল চেয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলোর হিসাবে, দুর্যোগে নেপালে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রাথমিক হিসাবে নেপালে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩৮৭ বিলিয়ন নেপালি রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠার মতো জলবায়ু ঝুঁকিও এই দুর্যোগে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় ভূমির স্থিতিশীলতা কমে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে লাংটাং লিরুংয়ের ঢাল ধসে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সূত্রপাত হতে পারে। বরফ ও পাথরের ধস থেকে তৈরি হতে পারে কাদার প্রবল স্রোত। সেই স্রোতে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে অস্থায়ী জলাধার তৈরি হতে পারে। পরে এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে দুকূল ছাপিয়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
শনিবারও নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধান, মরদেহ উদ্ধার এবং পরিচয় শনাক্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে এটিকে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: ডেইলি সাবাহ, কাতার নিউজ এজেন্সি