
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার দশমাইলে বসেছে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ কলার পাইকারি হাট। ঢাকা-দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এই হাটে প্রতিদিন গড়ে কোটি টাকার কাঁচা কলা বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা এখান থেকে কলা কিনে শত শত ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাচ্ছেন।
বড় পরিসরের এই কলার হাটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগও। প্রতিদিন কয়েকশ শ্রমিক কলা বাছাই, পরিবহন ও ট্রাকে ওঠানোর কাজে যুক্ত থেকে আয় করছেন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, সোমবার দুপুরে তিনি দশমাইলে উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ কলার হাটটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি হাটে বিপুল পরিমাণ কলার আমদানি দেখতে পান। জেলার বাইরে থেকেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পাইকার এখানে কলা কিনতে আসছেন।
তিনি বলেন, কাহারোলের পাশাপাশি বীরগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর ও বোচাগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও সদর ও পীরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কলা চাষের উপযোগী জমি রয়েছে। লাভজনক হওয়ায় এসব এলাকায় দিন দিন কলা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন সময়ে সারাদেশে কলার চাহিদা বেশি থাকে। বর্তমানে বাজারে চাহিদার তুলনায় ভালো দাম এবং উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা কলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কলা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।
চলতি বছর দিনাজপুরে ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে কলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে অনুকূল আবহাওয়া ও বাজারে ভালো চাহিদার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩৫০ হেক্টর বেশি জমিতে কলা চাষ হয়েছে।
কাহারোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৫৪২ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়েছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৩৩৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১০৭ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ বেড়েছে।
তিনি বলেন, এ বছর কাহারোলে কলার বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরাও খুশি। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কলা চাষ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
হাটজুড়ে কলার কাঁদি, চলছে দর-কষাকষি
সোমবার সরেজমিনে দশমাইল কলার হাটে দেখা যায়, হাটজুড়ে সারি সারি কলার কাঁদি সাজানো রয়েছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভ্যান ও বিভিন্ন যানবাহনে করে কৃষকরা কলা নিয়ে আসছেন। পাইকারদের সঙ্গে দর-কষাকষির পর অনেক ক্ষেত্রেই ভ্যানের ওপর থেকেই কলা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
কাহারোল উপজেলার গুড়নুরপুর গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম লাইজু এবার ৫২ শতক জমিতে কলা চাষ করেছেন। তিনি জানান, দশমাইলের হাটে ১০০টি কলার কাঁদি এনে ৮২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে তার জমি থেকে প্রায় দুই লাখ টাকার বেশি কলা বিক্রি হবে বলে আশা করছেন।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, প্রতিটি কলার কাঁদি ৬৯০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। তিনি এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে কলা চাষ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারে এ ধরনের দাম অব্যাহত থাকলে এবার সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি কলা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
প্রতিদিন যাচ্ছে ৩-৪ ট্রাক কলা
ঢাকার ব্যবসায়ী মো. নিয়ামুল ইসলাম জানান, ভালো মানের কলার দাম তুলনামূলক বেশি। তিনি প্রতিদিন দশমাইলের হাট থেকে তিন থেকে চার ট্রাক কাঁচা কলা কিনে ঢাকায় পাঠাচ্ছেন।
হাটের শ্রমিক মো. সহেন আলী জানান, প্রতিদিন ট্রাকে কলা লোড করে একজন শ্রমিক প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। হাটে প্রতিদিন কয়েকশ শ্রমিক কলা ট্রাকে ওঠানোর কাজে নিয়োজিত থাকেন।
দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, কলা একটি লাভজনক ফসল। এ অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে উন্নত জাতের মেহেরসাগর, মালভোগ, চিনিচাঁপা ও সবরি কলা চাষের আগ্রহ বাড়ছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের কলা চাষে নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত চাষপদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার ফলে তারা ভালো ফলন পাচ্ছেন এবং বাজারে ভালো দামও পাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কলার বাজারে ভালো দাম ও চাহিদা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে দিনাজপুরে কলা চাষের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এতে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দশমাইলের মতো পাইকারি হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।