ঢাকারবিবার , ১৯ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ

কার্বন শোষণে পরিবেশবান্ধব নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৯ জুলাই ২০২৬, ৯:৫৭ সকাল

Link Copied!

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় আতঙ্ক। বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের শিকার শহরগুলোতে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা শহরে তাপ ধরে রাখার প্রবণতা, যার একটি বড় নেপথ্য কারিগর হলো আমাদের নির্মাণ শিল্প। প্রচলিত সিমেন্ট বা কনক্রিট উৎপাদন ও ব্যবহার প্রক্রিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড (সিও২) বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, তা গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীকে তপ্ত করে তুলছে। তবে আশার কথা হলো, বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এমন এক প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন যা সিমেন্ট বা কনক্রিট তৈরির সময়ই বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে তা স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিকে বলা হচ্ছে ‘কার্বন নেগেটিভ’ বা ‘সবুজ কনক্রিট’ প্রযুক্তি।

এটি যে ধরণের প্রযুক্তি:
এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো ‘কার্বন মিনারেলিজেশন’ বা খনিজকরণ পদ্ধতি। এই উদ্ভাবনের পেছনে কাজ করছেন বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, পরিবেশ প্রকৌশলী এবং নির্মাণ প্রযুক্তিবিদদের একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক দল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— গ্লোবাল ম্যাটেরিয়ালস ল্যাবের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো প্রযুক্তিবিদ ড. এলিনা মার্সি, এবং কনস্ট্রাকশন টেকনোলজির হেড অব গ্রিন প্রকৌশলী মার্কাস জোহানসন। তারা মূলত সিমেন্টের রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন এনে এতে কার্বন ডাই অক্সাইডকে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ করার পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছেন।

গবেষণা পদ্ধতি:
এই প্রযুক্তির উন্নয়ন কোনো রাতারাতি ঘটনা নয়। গবেষক দল গত এক দশক ধরে ন্যানো-প্রযুক্তি এবং রাসায়নিক প্রকৌশল ব্যবহার করে এই পরীক্ষা চালিয়েছেন। তারা বিভিন্ন দেশের কারখানা থেকে নির্গত সিও২ গ্যাস সংগ্রহ করে সেটিকে নির্দিষ্ট চাপে কনক্রিট মিশ্রণের সঙ্গে মেশানোর হার নিয়ে কয়েক হাজার বার ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট মাত্রায় কার্বন ডাই অক্সাইড যোগ করলে কনক্রিটের ভেতরকার হাইড্রেশন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, যা একে দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী করে তোলে।

এই প্রযুক্তিটি যেভাবে কাজ করে:
সিমেন্ট বা কনক্রিট শিল্পে এই প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রক্রিয়াটি মূলত ‘কার্বন মিনারেলিজেশন’ বা খনিজকরণ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সাধারণ কনক্রিট তৈরির সময় সিমেন্ট, পানি এবং পাথর বা বালুর মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নতুন এই প্রযুক্তিতে কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে সংগৃহীত সিও২-কে উচ্চচাপে কনক্রিটের মিশ্রণে ইনজেক্ট করা হয়। এরপর সিমেন্টের ক্যালসিয়াম অক্সাইডের সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইডের এক বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড আর গ্যাস হিসেবে থাকে না, বরং এটি কঠিন ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা চুনাপাথরে রূপান্তরিত হয়। ফলে কনক্রিটটি কেবল মজবুতই হয় না, বরং এটি একটি স্থায়ী কার্বন সংরক্ষণাগার হিসেবে কাজ করে।

দ্বিতীয় একটি পদ্ধতি হলো ‘কার্বন-কিউরিং’। এই পদ্ধতিতে কনক্রিট ব্লক তৈরির পর সেগুলোকে একটি বিশেষ কার্বন-সমৃদ্ধ চেম্বারে রাখা হয়। সাধারণ বাতাসে কিউরিং করার পরিবর্তে এই কৃত্রিম পরিবেশে কনক্রিট দ্রুত শক্তিশালী হয় এবং বায়ুমণ্ডলের কার্বন নিজের ভেতর শুষে নেয়। এটি নির্মাণের স্থায়িত্ব বাড়াতেও দারুণ ভূমিকা রাখে।

শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা:
ঢাকা বা বড় বড় মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে বহুতল ভবন নির্মাণে প্রচুর কনক্রিট ব্যবহার করা হয়। এই কনক্রিট দিনের বেলা তাপ শোষণ করে এবং রাতের বেলা তা বিকিরণ করে, যা শহরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেয়। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তিতে তৈরি কনক্রিট তাপ শোষণে ভিন্নধর্মী আচরণ করে। কার্বন মিনারেলযুক্ত কনক্রিট প্রথাগত কনক্রিটের তুলনায় কম তাপ সঞ্চয় করে। ফলে শহরের সামগ্রিক তাপমাত্রা হ্রাস পেতে সহায়তা করবে এবং ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব কমিয়ে আনবে।

শিল্পে এই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা:
বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৮ শতাংশ আসে শুধু সিমেন্ট শিল্প থেকে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলছে দ্রুতগতিতে, যার ফলে কনক্রিটের চাহিদা আকাশচুম্বী। যদি নির্মাণ শিল্পে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা না হয়, তবে আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয় মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কার্বন শোষণকারী কনক্রিট ব্যবহারের মাধ্যমে নির্মাণ শিল্প এখন আর পরিবেশের ক্ষতি করবে না, বরং এটি একটি ‘কার্বন সিংক’ বা কার্বন শোষক হিসেবে কাজ করবে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে নতুন পথ দেখাবে।

চ্যালেঞ্জসমূহ:
সাধারণ কনক্রিটের চেয়ে কার্বন-ইনজেক্টেড কনক্রিটের উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি। কারখানা থেকে সরাসরি কার্বন ক্যাপচার করে তা নির্মাণ সাইট পর্যন্ত পরিবহন করা বেশ জটিল একটি প্রক্রিয়া। অনেক দেশে এই নতুন প্রযুক্তির মানদণ্ড নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামো বা সরকারি নীতিমালা নেই। তবে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা অনেক বেশি।

কনস্ট্রাকশন টেকনোলজির হেড অব গ্রিন প্রকৌশলী মার্কাস জোহানসন জানান, একটি বহুতল ভবন নির্মাণের সময় সিমেন্ট উৎপাদন থেকে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, তা আমাদের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। কিন্তু আমাদের উদ্ভাবিত এই ‘কার্বন-কিউরিং’ প্রযুক্তি সেই ধারণাটি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আমরা যখন কনক্রিট তৈরির সময় উচ্চচাপে কার্বন ডাই অক্সাইড ইনজেক্ট করি, তখন এটি আর ক্ষতিকারক গ্যাস হিসেবে বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে না। বরং এটি সিমেন্টের উপাদানের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে স্থায়ী ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা খনিজে পরিণত হয়। অর্থাৎ, যে ভবনটি আপনি তৈরি করছেন, সেটিই একটি কার্বন শোষক যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেখানে প্রতি বছর নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠছে, সেখানে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিশাল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে বহুতল ভবন নির্মাণে এই সবুজ কনক্রিট ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমিয়ে আনতে পারি। এছাড়াও সরকারি বড় বড় প্রকল্প, যেমন—মেট্রোরেল, বড় ফ্লাইওভার বা পদ্মা সেতুর মতো অবকাঠামোয় এই কনক্রিট ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারবে।

ভবিষ্যৎ পথচলা:
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে মুক্তি পেতে আমাদের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। কার্বন ডাই অক্সাইডকে আবর্জনা হিসেবে না দেখে তাকে কনক্রিটের শক্তি বাড়ানোর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করার এই মানসিকতা কেবল নির্মাণ শিল্পকেই বদলে দেবে না, বরং আগামীর শহরগুলোকে করবে বাসযোগ্য। এখন প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয়। আমরা যদি আজ থেকেই এই কার্বন শোষণকারী প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করতে পারি, তবেই আমাদের উন্নয়ন সার্থক হবে। এটি কেবল একটি নির্মাণ কৌশল নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও শীতল পৃথিবী গড়ার লড়াই।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করবে স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট

কার্বন শোষণে পরিবেশবান্ধব নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন

দেশে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নরসিংদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় টমটম চালক নিহত

ভবিষ্যতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলবে চীনের বুলেট ট্রেন

বিশ্ববাজারে বেড়েছে আর্জেন্টিনার গরুর মাংসের চাহিদা

দেশজুড়ে আরও পাঁচ দিন বৃষ্টির আভাস, কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের শঙ্কা

শতাব্দীর দীর্ঘতম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হবে সৌদি আরব

সন্ধ্যার মধ্যে ৮ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত

সীতাকুণ্ডে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে পর্যটকের মৃত্যু

Jamal Bhuyan Joined OPPO as Shop Manager!