
বাংলাদেশে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বায়ু দূষণ বেড়েছে। বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, ইটভাটা, শিল্প-কারখানা, মোটরযান ও নির্মাণ কাজ থেকে নির্গত ধূলিকণা বা ক্ষতিকর গ্যাসের কারণে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে বিশ্বে বায়ু দূষণের শীর্ষ দেশের তালিকায় রায়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও দেশের পরিবেশ রক্ষায় বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালার পরিকল্পিত প্রয়োগ জরুরি।
রোববার (১৯ জুলাই) পরিবেশ অধিদপ্তরের অডিটরিয়ামে আয়োজিত “বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ : জলবায়ুর জন্য পদক্ষেপ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলি” শীর্ষক আলোচনা সভায় ব্ক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে, পরিবেশ অধিদপ্তর, সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ), ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট, ইউল্যাব ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আর্থ ফাউন্ডেশন, আইডাব্লিউবি, আর্ক ফাউন্ডেশন, গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটি এবং বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ও সিটিজেন নেটওর্য়াক(সিনেট)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউল হক। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. আক্তার মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. রুমানা হক, সিএলপিএ এর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান, ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, গ্রাম বাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক একেএম মাকসুদ ও সিএলপি এর অ্যাডভাইজার অধ্যাপক আ স ম সরোয়ার।
সিএলপিএ এর সিনিয়র পলিসি এনালিস্ট কামরুন্নিছা মুন্নার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার নাইমা আক্তার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আর্থ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আমিনুল ইসলাম বকুল। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে বায়ুদূষণে প্রধান ৬টি শহরে প্রতিদিন ২৪২ জন মৃত্যুবরণ করে। বায়ুদূষণজনিত মোট মৃত্যুর ৪৮ শতাংশই হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। ঢাকায় বছরে প্রায় ৬৮৭০৩ জন ও চট্টগ্রামে প্রায় ১১২০২ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। গত ২৮ বছরে ঢাকায় সবুজ এলাকা ৯% কমে গেছে। অন্যদিকে দুই দশকে ঢাকায় কংক্রিটের আচ্ছাদন বেড়ে হয়েছে ৮২%, জলাভূমি নেমে এসেছে মাত্র ২.৯%। বায়ুদূষণে প্রতিদিন হাঁটা বা অযান্ত্রিক যানবাহনের ওপর যারা নির্ভরশীল তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, সারাদেশে গ্রহস্থলী বর্জ্য, পলিথিন বিভিন্ন ময়লার ভাগাড়ে পুড়িয়ে বায়ুদূষণ প্রকট করা হচ্ছে। ভাসমান মানুষ যারা ঢাকা আশ্রয় নেয় তারা বর্জ্য ব্যবস্থায় বেশি কাজ করেন। ফলে তাদের স্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া ইলেক্ট্রিক বর্জ্যও পরিবেশ দূষণের কারণ। অনেকে এই বর্জ্য দিয়ে বিদুৎ উৎপাদনের কথা বললেও সেটাতেও বায়ু দূষণ বেড়েছে। ফলে সব ধরনের বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে হবে। দেশে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ু ও পরিবেশ দূষণ।
তারা আরও বলেন, বায়ুদূষণের কারণে সারাবিশ্বে ২৮৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জিডিপির ৮.৩ শতাংশ বায়ুদূষণে ব্যয় হচ্ছে। যারা বায়ুদূষণ কমাতে কাজ করছে বা যেসবপণ্য বায়ুদূষণ কমাতে ব্যবহার হয় সেগুলো আমদানিতে কর হার কমানো প্রয়োজন। একইসঙ্গে বায়ুদূষণের জন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।
অনুষ্ঠানে শূন্য কার্বন নির্গমনের দুটি যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে হাঁটা ও বাইসাইকেলে যাতায়াতে গুরুত্বারোপ করে বক্তারা বলেন, বিশ্বে ৪৫ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন কর্মস্থল/শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইকেলে যাতায়াত করলেও বাংলাদেশে এটা খুবই নগণ্য। ফলে কম তাপ শোষণকারী নির্মাণসামগ্রী ও সর্বোপরি সবুজ অবকাঠামোর ব্যবহার এবং খাল, লেখ ও রেলপথ সংলগ্ন এলাকায় সবুজ হাঁটা ও সাইকেল করিডোর উন্নয়ন করা জরুরি।