
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে দেশে মোট ৫৮৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪৯০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৯৩ কোটি ডলার বা ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
একই সময়ে দেশের রফতানি আয়ও বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ পরিমাণ বেড়েছে ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬৪২ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থ পাচারে কড়াকড়ি আরোপ এবং হুন্ডির প্রবণতা কমে আসায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায় আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দরে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে।
বর্তমানে আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারের দর ১২৩ টাকার আশপাশে রয়েছে। গত মাসের শুরুতে এ দর বেড়ে ১২৩ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছিল। ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ডলারের দর ৮৪ টাকার নিচে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৫২৭ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ বেশি। বিপরীতে রফতানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৮৬ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ কম।
এরপরও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। নিট রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ হিসাব অনুযায়ী দেশের রিজার্ভ নেমে গিয়েছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। পরে অর্থ পাচার ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে রিজার্ভে উন্নতি হয়েছে।
২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভ কমতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করায় রিজার্ভ আরও কমে যায়।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পরও রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানায় সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যেও আগস্টে রফতানি গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে ৪৪৩ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। গত বছরের আগস্টে রফতানি হয়েছিল ৩৯২ কোটি ডলার। তবে জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রফতানি কমেছে ৩০ কোটি ডলার। জুলাইয়ে রফতানি হয়েছিল ৪৭৩ কোটি ডলার।
গত বছরের আগস্টে রফতানি কম হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা। আগস্ট থেকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা থাকায় রফতানিকারকেরা জুলাইয়ে পণ্য জাহাজীকরণে বাড়তি তৎপরতা দেখান। পরে ১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করে।
এদিকে, আগস্টে তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ মাসে ৩৬১ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। তবে জুলাইয়ে পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ৩৮৯ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশের রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৭৫০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৭১১ কোটি ডলার। অর্থাৎ দুই মাসে রফতানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।