ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. মতামত

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৭ জুন ২০২৬, ৩:১৪ বিকাল

Link Copied!

প্রতি বছর ৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস (World Food Safety Day)। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর যৌথ উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয় খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হলো “From Burden to Solutions – Safe Food Everywhere” (সমস্যা থেকে সমাধানে: সর্বত্র নিরাপদ খাদ্য)। এ বছরের প্রতিপাদ্যে খাদ্যবাহিত রোগের প্রকৃত বোঝা (burden) নিরূপণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

কেন নিরাপদ খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ?

খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান। কিন্তু খাদ্য যদি জীবাণু, রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু বা অন্যান্য দূষক দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে তা নানা ধরনের রোগের কারণ হতে পারে। WHO-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর শতকোটি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু ঘটে। শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও নজরদারি কার্যক্রম জোরদার করলেও এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।

  • খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিকের ব্যবহার: বিভিন্ন মৌসুমে ফলমূল পাকাতে কার্বাইড, ফরমালিন কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। মাছ, মাংস, শাকসবজি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যেও কখনও কখনও অননুমোদিত উপাদান ব্যবহারের ঘটনা সামনে আসে। এসব পদার্থ দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভারের সমস্যা এবং হরমোনজনিত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

 

  • রাস্তার খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে রাস্তার খাবার অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে খাবার প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের সময় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হয়না। বিশুদ্ধ পানির অভাব, অপরিষ্কার বাসনপত্র এবং ধুলাবালির সংস্পর্শ খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

  • খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে দুর্বলতা: খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্য পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বিপণনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু পর্যাপ্ত কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থার ঘাটতি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

 

  • জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততা খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে খাদ্য দূষণ ও খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সরকারের উদ্যোগ

বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সিং এবং জনসচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, সিটি করপোরেশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি সংগঠনসমূহও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে করণীয়

সরকারের জন্য

# খাদ্য পরীক্ষাগারের সংখ্যা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি।

# উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা।

# খাদ্যবাহিত রোগের জাতীয় ডাটাবেস তৈরি।

# বিজ্ঞানভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

খাদ্য ব্যবসায়ীদের জন্য

# স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা অনুসরণ।

# অনুমোদিত উপাদান ব্যবহার নিশ্চিত করা।

# খাদ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ।

ভোক্তাদের জন্য

# বিশ্বস্ত উৎস থেকে খাদ্য ক্রয়।

# ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া।

# রান্না করা ও কাঁচা খাবার আলাদা রাখা।

# মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য পরিহার করা।

# খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২৬-এর মূল বার্তা হলো—খাদ্যবাহিত রোগের বোঝা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে তা কার্যকর সমাধানে রূপান্তর করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায় যে, “নিরাপদ খাদ্য সবার অধিকার”—এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও ভোগের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২৬ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা একটি সুস্থ, নিরাপদ ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং একটি মানবিক ও টেকসই সমাজ গঠনের পথ আরও সুগম হবে।

লেখক : মোয়াজ্জেম হোসেন টিপু, উন্নয়নকর্মী ও কর্মসূচি সমন্বয়কারী, ডাস্।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চাঁদপুরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে ৬ যানবাহনকে জরিমানা

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৬ মৃত্যু

ভিভো ভি৮০: নতুন রং ও নতুন ডিজাইনে আসছে নতুন চমক

vivo V80: Arriving in a New Colour with a New Design

ক্রোনস ও আলসারেটিভ কোলাইটিস: দুই রোগের পার্থক্য, লক্ষণ ও চিকিৎসা

জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের হাতে দুই দশক: বিশ্বব্যাংক

Xiaomi Unveils REDMI 17 5G Featuring a Snapdragon 5G Processor

স্ন্যাপড্রাগন ফাইভজি প্রসেসরসহ রেডমি ১৭ ফাইভজি উন্মোচন করল শাওমি

আগামী গ্রীষ্মের আগে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে: প্রধানমন্ত্রী