
দশ বছরেরও বেশি সময় পর বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের হত্যার বিচারহীনতা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের জন্য ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এক নতুন ও মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) ‘আন্তর্জাতিক সাংবাদিক হত্যায় দায়মুক্তি অবসান দিবস’ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ইউনেস্কোর মহাপরিচালকের ‘নিরাপত্তা এবং দায়মুক্তির বিপদ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪-২০২৫ মেয়াদে বিশ্বজুড়ে নিশ্চিতভাবেই ১৮৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, যা আগের দুই বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি এবং ২০১৪-২০১৫ সালের পর এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থাৎ ১২৭ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে।
বিচারহীনতার হার ৮৬ শতাংশ :
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের হত্যার ঘটনায় বিচার না পাওয়ার হার বেড়ে ২০২৪-২০২৫ সালে ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের তুলনায় এক শতাংশ বেশি। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এই দায়মুক্তির হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার বাণীতে বলেন, ‘গত এক বছরে অন্তত ৩৪ জন সাংবাদিক চরম মূল্য দিয়েছেন। প্রতি সাতটি হত্যার মধ্যে ছয়টিরই কোনো বিচার হয় না। সংঘাতের ক্ষেত্রে এই দায়মুক্তির হার প্রায় শতভাগ। এটি ভুক্তভোগী ও তাদের প্রিয়জনদের জন্য একটি জঘন্য অপমান।’
সব অঞ্চলেই ‘বিশ্বব্যাপী অভিশাপ’:
প্রতিবেদনে সাংবাদিক হত্যার ঘটনাকে ‘বিশ্বব্যাপী অভিশাপ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ মেয়াদে বিশ্বের সব অঞ্চলেই সাংবাদিক নিহতের রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৭টি ঘটনা ঘটেছে আরব দেশগুলোতে। এ ছাড়া ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৩৭টি, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৩৪টি, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ১৪টি, আফ্রিকায় ৬টি এবং পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ফিলিস্তিনেই দুই বছরে যথাক্রমে ৩০ ও ৩২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
ড্রোন হামলা: নতুন ও আশঙ্কাজনক হুমকি :
প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের ওপর ড্রোন হামলার মতো একটি নতুন ও ভয়ংকর ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ সালে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিহত সাংবাদিকদের ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৫০ জনই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া স্পষ্টভাবে ‘প্রেস’ লেখা ভেস্ট পরিহিত বা গাড়ি ব্যবহারের পরও ১৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে।
ইউনেস্কোর মহাপরিচালক খালেদ আল-নানি সংঘাতের সময় সাংবাদিকদের বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে সুরক্ষা দিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২০১৫ সালের ২২২২ নম্বর রেজুলেশন এবং ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নারী সাংবাদিকদের ঝুঁকি :
প্রতিবেদনে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ মেয়াদে নিহত ১৪ জন নারী সাংবাদিকের ১৩ জনই ছিলেন সশস্ত্র সংঘাতে জর্জরিত দেশগুলোতে। এছাড়া ইউএন উইমেন ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্টসের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক অনলাইন বা অফলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
আশার আলো: দ্বন্দ্বহীন অঞ্চলে অগ্রগতি :
সংঘাতের বাইরের দেশগুলোতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অ-সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাংবাদিক হত্যার সংখ্যা কমে ৮৫টিতে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া এসব দেশে দায়মুক্তির হার ২০১২ সালের ৯৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৭৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইউনেস্কো জানিয়েছে, সরকারগুলো যদি সাংবাদিকদের তদন্ত, বিচার এবং সুরক্ষায় যথাযথ বিনিয়োগ করে, তবে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।