
সমুদ্রের এমন এক গভীর অঞ্চলে, যেখানে সূর্যের আলোও পৌঁছায় না, সেখানে নতুন ভূস্তর তৈরির একটি বিরল ও রোমাঞ্চকর প্রক্রিয়া প্রথমবারের মতো সরাসরি রেকর্ড করেছেন বিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব ভারতীয় শৈলশিরা অঞ্চলে এ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ (CNRS)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে সমুদ্রের তলদেশে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হয়। ওই ফাটল দিয়ে বিপুল পরিমাণ লাভা বেরিয়ে এসে অল্প সময়ের মধ্যেই জমে নতুন সমুদ্রতল বা ভূস্তর তৈরি করে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা স্বয়ংক্রিয় শব্দ-পর্যবেক্ষণ যন্ত্র (অটোনোমাস হাইড্রোফোন) ব্যবহার করে রেকর্ড করা সম্ভব হয়।
এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সমুদ্রের তলদেশের টেকটোনিক ক্রাস্ট প্রতি বছর গড়ে প্রায় আড়াই ইঞ্চি করে ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তবে নতুন ভূস্তর অনেক সময় আকস্মিক ও অত্যন্ত দ্রুতগতির ভূতাত্ত্বিক ঘটনার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, টেকটোনিক প্লেট দুটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি হয় এবং মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি ঘনমিটার ম্যাগমা সমুদ্রতলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে নতুন ভূস্তর গঠন করে। বিপুল পরিমাণ ম্যাগমা বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা চেম্বার প্রায় খালি হয়ে যায় এবং সমুদ্রতলের উপরের অংশ প্রায় ৪ দশমিক ২ মিটার (১৩ দশমিক ৮ ফুট) নিচে ধসে পড়ে।
গবেষণার অন্যতম সদস্য ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী জাঁ-ইভস রয় বলেন, টেকটোনিক প্লেট দুটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় দুই ইঞ্চি গতিতে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল। এত দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন।
গবেষকদের মতে, প্রায় ৪০ বছরে একবার ঘটতে পারে এমন এই বিরল ঘটনাটি পৃথিবীর ভূত্বক গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, সমুদ্রের তলদেশের নতুন ভূস্তর ধীরগতিতে নয়, বরং আকস্মিক ও শক্তিশালী ভূতাত্ত্বিক ঘটনার মাধ্যমেই তৈরি হতে পারে।