
ভুক্তভোগী ও সেবাপ্রার্থীদের মানসিক অবস্থা বুঝে সেবা দেওয়া এবং পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে রাজশাহীতে মনোসামাজিক পরিচর্যা ও কাউন্সেলিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে নারী ও শিশু, প্রতিবন্ধী, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি এবং আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের সঙ্গে কীভাবে সংবেদনশীলভাবে আচরণ করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গতকাল বুধবার রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়জুল করিম।
অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তা, নারী ও শিশু হেল্প ডেস্ক এবং ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে কর্মরত সদস্যরা অংশ নেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মোহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেন, পুলিশের কাছে আসা অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো সমস্যায় থাকেন। পারিবারিক বিরোধ, নির্যাতন, সম্পত্তি, আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় পুলিশের কাছে আসেন। তাই তাঁদের মানসিক অবস্থা বুঝে আচরণ করতে পারলে পুলিশের প্রতি মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, পুলিশ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করে না, সামাজিক নানা সমস্যাও মোকাবিলা করতে হয়। ফলে পুলিশ সদস্যদের মনোসামাজিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। একই সঙ্গে নিজেদের মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতাও তাঁদের প্রয়োজন।
পুলিশ কমিশনার বলেন, দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। তরুণদের মধ্যেও হতাশা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। কাউন্সেলিং ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এসব সমস্যা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তিনি রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের আরও সদস্যকে এ ধরনের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সদস্যদের শেখা বিষয়গুলো অন্য সহকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় পুলিশ সদস্যদের অনেকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করায় তাঁদের মানসিক পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়ার জন্য ওয়ার্ল্ড ভিশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আরএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, পুলিশ সমাজেরই অংশ এবং মানুষের মন বুঝে কাজ করা পুলিশের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মানসিক চাপ সামলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাদাভাবে সংবেদনশীল আচরণ করতে হয়।
প্রশিক্ষণের আলোচনায় অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যরা মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পবা থানায় প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু কোনো কথা বলছিল না। পুলিশ পোশাক দেখে শিশুটি ভয় পাচ্ছিল। পরে তাঁকে খাতা-কলম দিয়ে, চেয়ারে বসিয়ে এবং গল্প করে শিশুটিকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে শিশুটি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে এবং ঘটনার বিবরণ দেয়।
আরেক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ১২ বছর বয়সী এক মেয়েকে পাওয়া গিয়েছিল, যে নিজের নাম ছাড়া অন্য কোনো তথ্য সঠিকভাবে দিচ্ছিল না। পরে সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগ ও পরিবারের তথ্য যাচাই করে তার বাবাকে খুঁজে বের করা হয়।
আরেকজন কর্মকর্তা জানান, আত্মহত্যার কথা লিখে একটি চিরকুট নিয়ে এক স্কুলছাত্রী থানায় এসেছিল। দীর্ঘ সময় কথা বলে, পাশে বসিয়ে ও পানি খাওয়ানোর মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে আস্থা তৈরি করা হয়। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।
ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের এক সদস্য বলেন, সেখানে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি, ভাসমান নারী ও নানা ধরনের অসহায় মানুষ আসেন। তাঁদের অনেকের আচরণ অস্বাভাবিক হতে পারে এবং কখনো শারীরিকভাবেও তাঁরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। এসব ক্ষেত্রে মানসিক ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিতে হয়।
প্রশিক্ষণে বলা হয়, মনোসামাজিক সুস্থতার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শোনা, বোঝা এবং পাশে থাকা। কোনো সহকর্মী বা ভুক্তভোগী মানসিক চাপে থাকলে তাঁকে দুর্বল মনে না করে তাঁর কথা শোনা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

প্রশিক্ষণের আয়োজকেরা জানান, এ ধরনের প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো ভুক্তভোগী ও সেবাপ্রার্থীদের উন্নত সেবা দেওয়া এবং পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কগুলোকে আরও শিশুবান্ধব ও সেবাবান্ধব করার বিষয়েও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ এবং আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে মনোসামাজিক কাউন্সেলিংয়ের কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।
দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুরশিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব শিশুদের মানসিক বিকাশ, ট্রমার প্রভাব, ভুক্তভোগী শিশুর আচরণগত পরিবর্তন, নিরাপদ যোগাযোগ এবং মনোসামাজিক সহায়তার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরেন। শিশু আইন, ২০১৩-এর আলোকে শিশু সুরক্ষা, ভুক্তভোগী শিশুর মানসিক অবস্থা বোঝা, কার্যকর যোগাযোগ, কাউন্সেলিং ও মনোসামাজিক সহায়তা নিয়েও আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মানসিক চাপ ও ট্রমা মোকাবিলা করে কর্মক্ষেত্রে তা ইতিবাচকভাবে প্রয়োগের কৌশল শেখানো হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রাজশাহী শহর এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কো-অর্ডিনেশন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার লোটাস চিসিম। তিনি বলেন, শিশু আইন, ২০১৩-এর আলোকে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে থানা নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কের সঙ্গে ‘সিটিজেন ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকশন’ ইন্টারফেস মিটিংয়ের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণে আরএমপির কাশিয়াডাঙ্গা, রাজপাড়া, বোয়ালিয়া, মতিহার, চন্দ্রিমা ও শাহমখদুম থানার নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কের কর্মকর্তা, এএসআই, এসআই ও ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ৩০ জন এবং ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পাঁচজন কর্মকর্তা অংশ নেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ রাজশাহী শহর এডিপির প্রোগ্রাম অফিসার রিপন হালদার। অনুষ্ঠানে রাজশাহী জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মো. আতিকুর রহমান, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার নীলু বেগম, প্রোগ্রাম অফিসার ফিলিপ আরিন্দা, জুনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মোছা. শারমিন আক্তার সুরভী, অর্জুন রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।