
দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও জনস্বাস্থ্যের চরম ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক ‘প্যারাকোয়াট ডাইক্লোরাইড’-এর ওপর দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা জারির পথে হাঁটছে ভারত। ভারতের কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এই কীটনাশকের উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য একটি খসড়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট ও আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ‘প্যারাকোয়াট ডাইক্লোরাইড নিষিদ্ধকরণ আদেশ, ২০২৬’-এর খসড়াটি গত ১৩ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশ করেছে। ১৯৬৮ সালের কীটনাশক আইনের ২৭ ধারা প্রয়োগ করে এই প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞাটি আনা হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত বা আপত্তির জন্য খসড়া প্রস্তাবটি ৩০ দিনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এই সময়ের পর বিজ্ঞপ্তিটি চূড়ান্ত হলে, এর উৎপাদন বা বিতরণের লাইসেন্সধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগামী তিন মাসের মধ্যে তাদের লাইসেন্স সরকারের কাছে জমা দিতে হবে।
প্যারাকোয়াট মূলত কৃষিক্ষেত্রে আগাছা দমনের জন্য ব্যবহৃত হলেও এটি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত প্রাণঘাতী হিসেবে পরিচিত। এর ভয়াবহতার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, মানবদেহে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া ঘটালে এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা অ্যান্টিডোট নেই, যা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। এছাড়া শরীরে প্রবেশের পর এটি সরাসরি ফুসফুসকে আক্রমণ করে এবং অপরিবর্তনীয় ফাইব্রোসিস বা টিস্যু শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা তৈরি করে, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ফুসফুস ছাড়াও এটি মানুষের লিভার, কিডনি, ত্বক এবং চোখের মারাত্মক ও স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। মাঠ পর্যায়ে স্প্রে করার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কণা শরীরে প্রবেশ করা বা ত্বকের ক্ষতের মাধ্যমে বিষক্রিয়ার শিকার হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে কৃষকদের।
বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও চীন অন্যতম। ভারত এত দিন কৃষিক্ষেত্রে এর ব্যবহার বজায় রাখলেও, জনস্বাস্থ্য ও প্রাণীকুলের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এবার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে ভারতের কয়েকটি রাজ্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে এর ব্যবহার সীমিত করার চেষ্টা করলেও, আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতায় তা সর্বজনীন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি চূড়ান্ত হলে ভারত সারা দেশে একটি অভিন্ন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সক্ষম হবে।