ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জীবন বীমা ও ব্যাংক
  3. লাইফস্টাইল

বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য: ২০২৫ সালের বৈশ্বিক অর্থনীতির পেছনের শক্তি

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৮ জুলাই ২০২৫, ৫:১৭ বিকাল

Link Copied!

নিউইয়র্কের এক সন্ধ্যায় যখন টাইমস স্কয়ারের অগণিত স্ক্রিনে ভেসে উঠছে টেক জায়ান্টদের লোগো, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, মুম্বাইয়ের শেয়ার বাজারে উঠানামা করছে বিশাল অঙ্কের কোম্পানির শেয়ার। আর সেই মুহূর্তে জাপানের টোকিওতে এক নীরব সম্মেলন কক্ষে বসে থাকা আর্থিক বিশ্লেষকরা চিহ্নিত করছেন বিশ্বের আর্থিক মানচিত্রে নতুন প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের আবির্ভাব। ২০২৫ সাল, এই মুহূর্তে, বৈশ্বিক অর্থনীতির নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য বিলিয়ন ডলার মূল্যের কোম্পানি, যাদের নামই এখন পুঁজিবাজার ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বব্যাপী এমন কোম্পানির সংখ্যা এখন হাজারেরও বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে ১,৮৭৩টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি—যা পুরো বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্য কেবল প্রযুক্তি খাতে নয়; স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা, ফিনান্স এবং ভোগ্যপণ্য খাতে তার প্রভাব স্পষ্ট। অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল, এবং টেসলার মতো কোম্পানিগুলো শুধু মার্কিন অর্থনীতির ভিত্তিই নয়, বরং বৈশ্বিক বিনিয়োগেরও প্রধান পছন্দ।

তবে এই গল্প কেবল আমেরিকার নয়। পূর্ব দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক বিলিয়ন ডলার কোম্পানি রয়েছে জাপানে—৪০৪টি। প্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও ইলেকট্রনিক্সের ক্ষেত্রে জাপানের অবস্থান সুদৃঢ়। তোশিবা, হোন্ডা, সনি, টয়োটা প্রভৃতির মতো কোম্পানিগুলো শুধু স্থানীয় বাজারে নয়, বিশ্ব বাজারেও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে। জাপানের ধীর কিন্তু সুসংহত অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে এই প্রবৃদ্ধি অনেকটাই টেকসই।

অন্যদিকে, ভারত এক নতুন সম্ভাবনার নাম। ২০২৫ সালে ভারতের বিলিয়ন ডলার কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৮টিতে। ভারতীয় অর্থনীতির নবীন শক্তি মূলত প্রযুক্তি, ফিনটেক এবং রিটেইল খাতে বিস্তৃত। টাটা, রিলায়েন্স, ইনফোসিস, উইপ্রোর পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে অসংখ্য ইউনিকর্ন স্টার্টআপ। একটি সময় ছিল যখন ভারত বৈশ্বিক উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না; এখন ভারতের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সারা পৃথিবীর প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে।

উত্তর আমেরিকার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ, কানাডা, ২২৮টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানির মাধ্যমে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ-নির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি প্রযুক্তির মতো খাতেও কানাডার অগ্রগতি লক্ষণীয়। একইভাবে যুক্তরাজ্যেও রয়েছে ২১৮টি কোম্পানি, যেগুলোর বেশিরভাগই ব্যাংকিং ও বিমা খাতের। লন্ডনের সিটি এখনো বিশ্বব্যাপী আর্থিক লেনদেনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

চীন, এক সময়ের ‘বিশ্বের কারখানা’, এখন ২১৬টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানির ঘাঁটি। তবে করোনা পরবর্তী সময় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য যুদ্ধ চীনের কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তারপরও আলিবাবা, টেনসেন্ট, বাইদুর মতো কোম্পানির শীর্ষ অবস্থান এখনো ধরে রেখেছে প্রযুক্তি খাতে।

আবার অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির প্রতিটিতে রয়েছে ১৪৩টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি। যদিও জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য এবং মূলত ইইউর আর্থিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, তবে নিজেদের ইনডাস্ট্রি ৪.০ রূপকল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিং শক্তির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে খনিজ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি একদিকে যেমন বিলিয়ন ডলার কোম্পানির জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতেও নতুন বিনিয়োগের উত্থান ঘটেছে।

ফ্রান্স (১৩১), সুইজারল্যান্ড (১২২), এবং সুইডেন (১১১) যথাক্রমে ইউরোপের আভিজাত্যপূর্ণ অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে। ফ্যাশন, খাদ্য ও ওষুধ শিল্পে ফরাসি কোম্পানিগুলোর রয়েছে বড় বাজার; সুইস ব্যাংকিং খাত বিশ্বখ্যাত; আর সুইডেনের ইকো-টেক কোম্পানিগুলো এখনো বিশ্বের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অগ্রদূত হিসেবে কাজ করছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও এক উল্টো চিত্র দেখা যায়। সৌদি আরবে রয়েছে ৯৮টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি, যার বেশিরভাগই পেট্রোকেমিক্যালস ও জ্বালানি খাতের সঙ্গে জড়িত। সৌদি অ্যারামকো বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর একটি। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতেও রয়েছে ৬২টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি। দুবাই ও আবুধাবির নেতৃত্বে এই দেশটি এক বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ইসরায়েল এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য—তারা তাদের ছোট ভূখণ্ড বা জনসংখ্যা সত্ত্বেও উচ্চ প্রযুক্তি বা বিশেষায়িত খাতে বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে। কোরিয়ার স্যামসাং, তাইওয়ানের টিএসএমসি, ইসরায়েলের সাইবার সিকিউরিটি স্টার্টআপগুলো বা থাইল্যান্ডের পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি—সবই মিলে বিশ্বের অর্থনীতির বহুমাত্রিকতা তুলে ধরে।

আফ্রিকার মধ্যে একমাত্র দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে ৪৩টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি। খনিজ, সেবা ও ব্যাংকিং খাত এই দেশকে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র বানিয়েছে। একইভাবে, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল (৫৮), আর্জেন্টিনা (১৮), চিলি (১৯) কিছুটা হলেও বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

রাশিয়ার অবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। মাত্র ১৫টি বিলিয়ন ডলার কোম্পানির উপস্থিতি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের ফলে দেশটির অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমা দেশগুলোর কড়াকড়ির কারণে দেশটির বৈশ্বিক বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তান (১২), ফিলিপাইন (১৪), ভিয়েতনাম (৩৪) এবং মিশরের (১) মতো উদীয়মান অর্থনীতি আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তাদের কোম্পানিগুলো এখন ধীরে ধীরে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার দিকে ঝুঁকছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৈশ্বিক বিলিয়ন ডলার কোম্পানির এক-তৃতীয়াংশের বেশি অবস্থান করছে। অন্যদিকে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো মিলিয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কোম্পানির ঠিকানা এখন এই অঞ্চলে। এর মানে দাঁড়ায়, বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন কেবল পশ্চিমেই সীমাবদ্ধ নয়—পূর্বেও উঠে এসেছে শক্তিশালী খেলোয়াড়রা।

২০২৫ সাল এখন অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের একটি যুগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তার লাভ করা এই বিলিয়ন ডলার কোম্পানিগুলো কেবল মাত্র আয়, পুঁজি বা বাজার দখলের প্রতীক নয়—তারা সেইসব দেশগুলোর নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক শক্তি এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের অন্যতম মূল স্তম্ভ। যেসব দেশে তারা গড়ে উঠছে, সেসব দেশের শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক কাঠামো, এবং অর্থনৈতিক নীতির উন্নয়নই তাদের সক্ষমতা নির্ধারণ করছে।

এই ধরণের কোম্পানিগুলোর উত্থান শুধু আর্থিক প্রবৃদ্ধির গল্প নয়, বরং একটি দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও প্রভাব বলয়ের পরিমাপক। সেই প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ সালের এই তালিকাটি এক অর্থনৈতিক মানচিত্র, যা আগামী দশকের প্রবণতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রতিফলন ঘটায়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস