ঢাকাশনিবার , ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • অন্যান্য

যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্ব বাতিলের গোপন ক্ষমতায় ঝুঁকিতে লাখো মুসলিম

নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫ ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ । ১২৯ জন

যুক্তরাজ্যে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাগরিকত্ব বাতিলের ‘চরম ও গোপন’ ক্ষমতা লাখো মুসলিম নাগরিককে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলছে-এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, এই ক্ষমতার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য মানবাধিকার ও নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রানিমিড ট্রাস্ট এবং রিপ্রিভ গত বৃহস্পতিবার যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ-যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ-আইনগতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ক্ষমতা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে পারিবারিক বা বংশগত সম্পর্ক রয়েছে-এমন নাগরিকদের ওপর অসমভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। ফলে মুসলিম সম্প্রদায় বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়ছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান নাগরিকত্ব বাতিলের ব্যবস্থা এখন মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি পদ্ধতিগত হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ‘উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারি’র সঙ্গে তুলনীয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

রানিমিড ট্রাস্ট ও রিপ্রিভের বিশ্লেষণে বলা হয়, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে-এমন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশই এসব অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

বর্তমান আইনে কোনো ব্রিটিশ নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে, যদি সরকার মনে করে যে তিনি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য। এমনকি তিনি সেই দেশে কখনো বসবাস না করলেও বা নিজেকে সে দেশের নাগরিক মনে না করলেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

অধিকারকর্মীদের মতে, এর ফলে যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্বের একটি বর্ণভিত্তিক স্তরবিন্যাস তৈরি হয়েছে। এতে মুসলিমদের নাগরিকত্ব কার্যত শর্তসাপেক্ষ হয়ে পড়ছে, যা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

রিপ্রিভের প্রতিনিধি মায়া ফোয়া মিডল ইস্ট আইকে বলেন, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আগের সরকার মানব পাচারের শিকার ব্রিটিশ নাগরিকদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই চরম ও গোপন ক্ষমতা আরও সম্প্রসারিত করেছে। তাঁর ভাষায়, “ভবিষ্যতে যদি কর্তৃত্ববাদী কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে ৯০ লাখ মানুষের অধিকার যে কোনো সময় কেড়ে নেওয়া হতে পারে-এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

রানিমিড ট্রাস্টের পরিচালক শাবনা বেগম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই যথেচ্ছ ক্ষমতা ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির মতো এখানেও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা নেই, যা অপব্যবহার ঠেকাতে পারে। তাঁর মতে, নাগরিকত্ব কোনো সুযোগ নয়-এটি একটি মৌলিক অধিকার। অথচ একের পর এক সরকার দ্বিস্তরের নীতি চালু করে বিপজ্জনক নজির তৈরি করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর পাঁচজনের মধ্যে তিনজন নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে থাকলেও শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি মাত্র ২০ জনে ১ জন। শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় অশ্বেতাঙ্গরা নাগরিকত্ব হারানোর ১২ গুণ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৯ লাখ ৮৪ হাজার, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ৬ লাখ ৭৯ হাজার এবং বাংলাদেশিসহ মোট ৩৩ লাখ এশীয় ব্রিটিশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন। বাস্তবে যাঁদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই দক্ষিণ এশীয়, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বংশোদ্ভূত মুসলিম।

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো শামিমা বেগমের মামলা। যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া এই তরুণীর নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় এই যুক্তিতে যে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক-িযা বাংলাদেশ সরকার অস্বীকার করেছে।

এ প্রতিবেদন এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকে দলের রাজনীতিকেরা আরও কঠোর অভিবাসন নীতির কথা বলছেন। দুই দলই এমন পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছে, যাতে আইনিভাবে বসবাসকারী লাখো মানুষকে যুক্তরাজ্য ছাড়তে বাধ্য করা হতে পারে।

তথ্যসুত্র: প্রথম আলো