ঢাকারবিবার , ৮ মার্চ ২০২৬

আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ

বিশ্ববাজারে তেলের সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম-কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

বিপ্লব হোসাইন
মার্চ ৮, ২০২৬ ৪:১৩ অপরাহ্ণ । ২৫৮ জন

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে। সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন, উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের দামে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ওপরও এর চাপ বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই বিশ্ববাজার দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, কারণ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্র।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Reuters–এর একাধিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হলে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। কারণ বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হিসাব করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দেন।

একই ধরনের বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে Bloomberg। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তেল পরিবহনের প্রধান সমুদ্রপথগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তেলের দাম বাড়তে থাকে।

বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ Strait of Hormuz–কে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এখানে কোনো ধরনের সংঘাত বা নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে তা পুরো বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

তেলের দাম বাড়লে খাদ্যপণ্যের দাম কেন বাড়ে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গম, ভুট্টা, চাল বা ভোজ্যতেল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সেচ, সার, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি ব্যবহার হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera–এর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে তা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ জ্বালানি ও খাদ্য—দুই খাতেই এর প্রভাব পড়ে।

বৈশ্বিক বাজারে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ

বিশ্ববাজারের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। অনেক দেশ ভবিষ্যৎ সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করার চেষ্টা করছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পণ্যের বাজারেও প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কিছু দেশে ভোজ্যতেল, গম এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, গম, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানি করে।

ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারেও দ্রব্যমূল্য বাড়ার ঝুঁকি দেখা দেয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার আমদানি ব্যয়ের চাপ অনুভব করেছে। যদি নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

কী করতে পারে বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় বাংলাদেশকে কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।

প্রথমত, প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের কৌশলগত মজুত বাড়ানো জরুরি। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ দাম বাড়লেও দেশের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা প্রয়োজন। একটি বা দুটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকলে সংকটের সময় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তৃতীয়ত, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেও স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়। কার্যকর তদারকি থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

চতুর্থত, দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার। খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা বাড়লে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশকেও তাই সতর্কভাবে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করতে হবে এবং সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।

তথ্যসূত্র

Reuters – বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা বিষয়ক প্রতিবেদন

Bloomberg – তেলের বাজার বিশ্লেষণ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব

Al Jazeera – মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাব বিষয়ক বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্য বিশ্লেষণ প্রতিবেদন