ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৬ অগাস্ট ২০২৬
  1. সর্বশেষ

স্বাস্থ্যখাতে জলবায়ু-সহিষ্ণু রূপান্তরের নতুন পথে বাংলাদেশ

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২১ জুন ২০২৬, ৫:০১ বিকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে যে নীরব ঘাতক বাসা বাঁধছে, তা মোকাবিলায় সরকার সম্প্রতি ‘হেলথ ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান (এইচএনএপি) ২০২৬-২০৩১’মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হবে?

গত ১২ জুন সচিবালয়ে উচ্চপর্যায়ের এক সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই মহাপরিকল্পনাটি অনুমোদন ও প্রকাশ করে। ‘হেলথ ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান (এইচএনএপি) ২০২৬-২০৩১’ শীর্ষক এই দলিলটি তৈরিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন যৌথভাবে কাজ করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল ফান্ড-এর কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় দীর্ঘ দুই বছর ধরে বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে এই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই পরিকল্পনাটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়, যা এখন থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাতের জলবায়ু-অভিযোজনের মূল নির্দেশিকা হিসেবে গণ্য হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি সরাসরি একটি স্বাস্থ্য সংকট। আইপিসিসি-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে গর্ভবতী মায়েদের উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি-একলাম্পশিয়া হওয়ার হার প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। শুধু তাই নয়, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব এখন সারা বছরই থাকছে। এইচএনএপি ২০২৬-এর প্রধান রূপকারদের মতে, এটি কেবল রোগের চিকিৎসা নয়, বরং রোগের কারণ ও সংক্রমণের উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা।
পরিকল্পনাটির অন্যতম চমক হলো ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট হেলথ সিস্টেম’। এর অধীনে দেশের ৪৬০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে জলবায়ু-সহিষ্ণু হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে রয়েছে- হাসপাতালের অবকাঠামোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং দুর্যোগের সময় সেবাদান অব্যাহত রাখতে মোবাইল ক্লিনিক বা ‘ফ্লোটিং হসপিটাল’ ব্যবস্থাকে জোরদার করা।

আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা যদি ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার তথ্য এবং আবহাওয়া উপাত্তকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সিস্টেমে যুক্ত করতে পারি, তবে রোগের প্রকোপ বাড়ার অন্তত দুই সপ্তাহ আগে আমরা পূর্বাভাস পাব। এইচএনএপি-২০২৬-এ সেই সুযোগ রাখা হয়েছে।’

এদিকে বিশ্বে খুব কম দেশের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় ‘ক্লাইমেট-ইন্ডুসড মেন্টাল হেলথ’কে এভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা দীর্ঘমেয়াদী খরার কারণে ভিটেমাটি হারানো মানুষের মধ্যে যে ‘ইকো-অ্যাংজাইটি’ বা পরিবেশগত দুশ্চিন্তা কাজ করে, তা এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বড় আলোচনার বিষয়। এইচএনএপি-২০২৬-এ প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানী ড. শায়লা পারভীন জানান, ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষ যখন সবকিছু হারায়, তখন তারা শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তারা তাদের শিকড় হারায়। এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে আমাদের সমাজভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, যা এই পরিকল্পনায় প্রথমবারের মতো উঠে এসেছে।’

তবে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল বাধা থাকে প্রশাসনিক সমন্বয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের জনবল সংকট এবং বাজেট বরাদ্দ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। জলবায়ু তহবিল থেকে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করাটা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।’ তিনি আরও বলেন, কেবল ঢাকা বা বড় শহর নয়, চরাঞ্চল ও দুর্গম হাওর এলাকার জন্য বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নিশ্চিত না করলে প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেনের মতে, ‘এটি একটি চমৎকার নথিপত্র। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রয়োগের ওপর। আমাদের প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিককে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। যদি একজন গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মী জানেন কীভাবে লবণাক্ত পানি ও ডায়রিয়ার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে হয়, তবেই এই পরিকল্পনা সফল হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘হেলথ ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান (এইচএনএপি) ২০২৬’ কেবল একটি সরকারি নথিপত্র নয়, এটি আমাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নতুন কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে অরক্ষিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম সবার ওপরে। তাই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়া মানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পতনের পথ প্রশস্ত করা। সরকার, দাতা সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এই স্মার্ট স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Xiaomi Launches REDMI 17: Bigger Battery & Stronger Protection

৭,৫০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে বাজারে এলো শাওমির রেডমি ১৭

ডিএনসিসির উদ্যোগে তামাক বিক্রি ও প্রচারণার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান

ভারতে বন্যা-ভূমিধসে শতাধিক প্রাণহানি

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

জুলাইয়ে সড়কে ঝরল ৪১৬ প্রাণ, এর এক-তৃতীয়াংশ মোটরসাইকেল আরোহী

অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় পাওয়ার টিলারচালক নিহত

আগামী ৫ দিন যেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া

জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বজুড়ে বাসস্থান বদলাচ্ছে প্রজাপতি

বৃষ্টি কমছে, ফসল নষ্ট হচ্ছে-জলবায়ু সংকটে চাপে ইউরোপের কৃষকেরা

তীব্র তাপপ্রবাহে ইতালির ২৭ শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা

চরম গরমে ভুগছে যুক্তরাজ্য, বাড়ছে সরকারি সেবার সংকট