
হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, শুধু ত্রাণ বা অস্থায়ী উদ্যোগ নয়, হাওরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় সরকার টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
শুক্রবার (৮ মে) সিলেট সার্কিট হাউস-এ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল, পলি জমে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়া, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সংকট আরও গভীর হয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।
তিনি বলেন, “আমরা হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান চাই। সেই লক্ষ্যেই আগামী পাঁচ বছরে কৃষি, পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।”
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অতীতে হাওরাঞ্চলে নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত। ফলে মানুষের প্রত্যাশিত উপকার মেলেনি। বরং নদী ও জলাভূমিতে পলি জমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, অনেক স্লুইস গেট অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং জলাবদ্ধতা বেড়েছে।
সাম্প্রতিক অকাল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ-এর বিভিন্ন এলাকা সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতোমধ্যে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তালিকাভুক্ত পরিবারগুলোকে তিন মাস সহায়তা দেওয়া হবে।
ড. তিতুমীর বলেন, “হাওরাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, নদী ও খাল খনন, জলমগ্ন ও ডুবন্ত সড়ক নির্মাণ, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, হাওর উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষিযন্ত্র সরবরাহ এবং সময়মতো শ্রমিক নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, অকাল বৃষ্টির আগেই যাতে কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারেন, সেজন্য দ্রুত পরিপক্ব হয় এমন ধানের জাত উদ্ভাবন জরুরি। একইসঙ্গে হারভেস্টার, ড্রায়ারসহ আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম সরবরাহের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বহু দেশীয় মাছ বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ায় পরাগায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তিনি জানান, একসময় টাঙ্গুয়ার হাওর-এ বিপুল পরিমাণ পরিযায়ী পাখি দেখা গেলেও এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই রামসার সাইট বর্তমানে নানা অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে।
সভায় নতুন হাওর ও জলাশয়-সংক্রান্ত আইনের আওতায় কৃষি, মৎস্য, পানি সম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও স্থানীয় জ্ঞানকে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
ড. তিতুমীর বলেন, গত ১৭ বছরে হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই ছিল “লুটপাট ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক”, ফলে টেকসই সমাধানের বদলে সংকট আরও বেড়েছে।
তিনি আরও জানান, কৃষকদের জন্য সরকার কৃষক কার্ড চালু করেছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকেরা বীজ, সার, বালাইনাশকসহ বিভিন্ন সেবা পাবেন এবং কৃষি পরিকল্পনাও আরও সহজ হবে।
মতবিনিময় সভায় মো. মশিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।