
দেশের পরিচিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর একটি বেদে সমাজ। নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের ধরন থাকলেও আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নানা কারণে পিছিয়ে রয়েছে এই জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে বেদে নারীদের জীবনসংগ্রাম, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগের ঘাটতি তাদের জীবনে নানা সংকট তৈরি করছে।
বেদে সমাজ মূলত নারীপ্রধান। পরিবার ও জীবিকার নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নারীদের ভূমিকা বেশি। জীবিকার প্রয়োজনে ভোরে বের হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কাজ করেন তারা। সাপের খেলা দেখানো, শিঙা ফুঁকা, বিষ-ব্যথা নামানোসহ ঐতিহ্যগত অনেক পেশা এখন হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে জীবিকার ধরনেও পরিবর্তন আসছে।
সাহিত্যেও বেদে নারীর জীবন ও সংগ্রাম উঠে এসেছে। প্রায় পৌনে চারশ বছর আগে কানাইয়ের ‘মহুয়া পালা’র মহুয়া চরিত্রকে কেন্দ্র করে বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নাগিনী কন্যার কাহিনি’ কিংবা আল মাহমুদের ‘জলবেশ্যা’তেও প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর নারী চরিত্র উঠে এসেছে।
বাস্তব জীবনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের মোড়, বেইলি রোড কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেখা যায় বেদে নারীদের। রঙিন পোশাক, পুঁতির মালা, চুড়ি ও বিভিন্ন অলংকার তাদের আলাদা করে চেনায়। তবে এসব সাজসজ্জার আড়ালে রয়েছে কঠিন জীবনসংগ্রাম এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বেদে নারীদের একটি বড় অংশ অল্প বয়সেই বিয়ে ও মাতৃত্বের মুখোমুখি হন। ফরিদপুরের মুন্সিবাজারের একটি বেদেপল্লিতে ১৮টি পরিবার বসবাস করছে। সেখানে সন্তানসম্ভবা নারীদের অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন। মাত্র ২১ বছর বয়সী শাবনুরের তিন সন্তান রয়েছে। চতুর্থ সন্তান জন্মের সময় তিনি অপুষ্টিতে ভুগছেন বলে জানা গেছে।
বেদে নারীদের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সংকট। সন্তান জন্মের জন্য তারা অনেক সময় সরকারি হাসপাতালেও যান না। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের কাছ থেকে অবহেলার আশঙ্কার কথা জানান তারা। ফলে নিজেদের গোষ্ঠীর অভিজ্ঞ ধাইদের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
সদরপুরের তসলিমা বেগম তেমনই একজন ধাই। শাশুড়ি ও দাদি শাশুড়ির কাছ থেকে শেখা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি বহু বছর ধরে বেদে নারীদের সন্তান প্রসবে সহায়তা করে আসছেন। তার হাতে কয়েকশ শিশুর জন্ম হয়েছে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী বলেন, বেদে জনগোষ্ঠীর নারীদের স্বাভাবিক প্রসবের সময় প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। তাদের জন্য নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের পাশাপাশি মৌলিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে কিশোরীদের মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে নারীর পাশাপাশি নবজাতকের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
অন্যদিকে মুন্সিগঞ্জের গোয়ালীমান্দা এ অঞ্চলের বেদে সম্প্রদায়ের পুরোনো আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করেন। অনেকেই দীর্ঘদিন আগে নৌকার জীবন ছেড়ে স্থলভাগে স্থায়ী হয়েছেন। জীবিকাতেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক নারী ঐতিহ্যগত শিঙা ফুঁকা কিংবা বিষ-ব্যথা নামানোর পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। মেয়েরা স্কুল-মাদ্রাসায়ও যাচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য সচেতনতার ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে রয়েছে এই জনগোষ্ঠী। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অনিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে তাদের। বিশেষ করে শিশু ও নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বৈষম্যহীন চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বেদেপল্লিগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।
বেদে জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসুরক্ষায় বছরে অন্তত দুবার মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের পাশাপাশি কিশোরী ও নারীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দরকার। কারণ একটি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে গেলে সামগ্রিকভাবে দেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তাও পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।