
২০২৪ সালের একটি ভোরবেলা। জার্মানির এক গ্রামাঞ্চলে সৌরচালিত প্যানেলের সারি সারি ধাতব প্যানেলগুলো যখন সূর্যের প্রথম আলোয় চকচক করছিল, তখন হাজার কিলোমিটার দূরে ভারতের ঝাড়খণ্ডে কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হচ্ছিল কালো ধোঁয়ার মেঘ। এ যেন এক পৃথিবীর দুই চেহারা—একদিকে সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্ন, অন্যদিকে পুরোনো শক্তির অবিচল নির্ভরতা।
বিশ্ব এখন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়েছে, কিন্তু এই অগ্রগতির চিত্র বিশ্বজুড়ে একরকম নয়।
ইউরোপ: সবুজ বিদ্যুতের নতুন ঠিকানা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই রূপান্তরের অগ্রভাগে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক—৪৮.৭ শতাংশ—এসেছে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি থেকে। জলবিদ্যুৎ, বায়ু ও সৌরশক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সবুজ অবকাঠামো। ফ্রান্সের পারমাণবিক নির্ভরতাও যুক্ত হয়ে তৈরি করেছে একটি কম-কার্বন নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যার ২৩.৬ শতাংশ এসেছে পারমাণবিক শক্তি থেকে। কয়লার ব্যবহার এখানে নেমে এসেছে মাত্র ১০.৭ শতাংশে, যা এক দশক আগেও ছিল দ্বিগুণের বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র: গ্যাসের ছায়ায় সবুজের বিকাশ
আটলান্টিকের ওপারে, যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় অংশ নিয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস—৪২.৬ শতাংশ। এটি নবায়ণযোগ্য জ্বালানির তুলনায় দ্বিগুণ, যদিও ২৩.৩ শতাংশ নবায়ণযোগ্য বিদ্যুৎ কোনোভাবেই ছোট নয়। পারমাণবিক শক্তিও রেখেছে দৃশ্যমান ভূমিকা—১৭.৯ শতাংশ। তবে এই অগ্রগতির ছায়ায় রয়ে গেছে কয়লা—এখনো ১৫.৬ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় এই দূষণকারী উৎস থেকে।
চীন: পরিবর্তনের মাঝে পুরোনোর আধিপত্য
বিশ্বের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদক চীন ২০২৪ সালে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি থেকে ৩৩.৯ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। তবে এদেশে এখনো কয়লাই সবচেয়ে বড় শক্তি—৫৮.৪ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এখান থেকে। এটি বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য এক বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে চীনের নবায়ণযোগ্য খাতে বিপুল বিনিয়োগ এবং পারমাণবিক শক্তির পরিমাণ (৪.৪ শতাংশ) একটি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয় যেখানে কয়লার ভূমিকা ক্রমেই কমে আসবে।
ভারত: সূর্যের আলোয় আশার রেখা
ভারত এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৭৩.৪ শতাংশই কয়লাভিত্তিক উৎস থেকে পাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও এক আশাজাগানিয়া অগ্রগতি হলো নবায়ণযোগ্য খাতে ২০.৫ শতাংশ অবদান। ২০১৪ সালে এই হার ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। এক দশকে তিনগুণের বেশি বৃদ্ধিই বলে দেয়, ভারতও বদলাচ্ছে—ধীরে হলেও দৃঢ়ভাবে। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তিতে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ আগামী বছরগুলোতে এই প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক চিত্র: পথ অনেক, গন্তব্য এক
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয়—বিশ্ব এখন এক দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। উন্নত অর্থনীতিগুলো নবায়ণযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ খাতকে ঢেলে সাজাচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো পুরোনো জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রেখে চলেছে এক সঙ্কট ও সম্ভাবনার সমান্তরালে।
একদিকে যেমন ইউরোপ দেখিয়ে দিচ্ছে কার্বন-নিম্ন শক্তির ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, অন্যদিকে ভারতের মতো দেশগুলো এখনো বিদ্যুৎ নিরাপত্তা আর শিল্প উন্নয়নের তাগিদে কয়লাকে ছাড়তে পারছে না। তবুও আশা আছে—কারণ পরিবর্তন শুরু হয়েছে। সূর্যের আলো এখন শুধু প্রকৃতিতেই নয়, বিদ্যুতের স্রোতেও আলো ছড়াচ্ছে।
প্রয়োজন শুধু একটিই—এই পরিবর্তনের গতিকে আরও জোরালো করা। যেন ভবিষ্যতের কোনো এক ভোরে, ঝাড়খণ্ডের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ধোঁয়া নয়, উঠে আসে পরিচ্ছন্ন শক্তির আশার আলো।