ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বায়ুদূষণ মোকাবিলায় ৫টি মূলনীতি ঘোষণা

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২২ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৫ সকাল

Link Copied!

বায়ু দূষণ বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশগত স্বাস্থ্য ঝুঁকি। দূষিত বাতাসের কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ অকাল মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বায়ু দূষণের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৯৭২ লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ। এই বিশাল অংকের ক্ষতি যদি কোনো দেশের অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে তা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে গণ্য হবে। এত বড় ঝুঁকি সত্ত্বেও যেখানে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, সেখানেই বায়ুর মান পরিমাপের সবচেয়ে মৌলিক হাতিয়ার—’ডেটা’ বা তথ্য—রয়ে গেছে চরম ঘাটতিতে।

ওপেনএকিউ -এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের ৩৬ শতাংশ দেশে বায়ুর মান পরিমাপের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। প্রায় ১০০ কোটি মানুষ এমন ৭১টি দেশে বসবাস করছেন, যেখানে সরকার যে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে, তার কোনো প্রমাণই নেই। বিশেষ করে মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানে বায়ু দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি, সেখানে ৩০ কোটি মানুষের জন্য একটিও মানসম্মত মনিটরিং স্টেশন নেই যা উন্মুক্ত তথ্য শেয়ার করে। তথ্যের এই অভাবের কারণে সরকার, স্থানীয় সম্প্রদায় বা উন্নয়ন সংস্থাগুলো বায়ু দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

এদিকে গত এক দশকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে কম খরচে বায়ুর মান পরিমাপের সেন্সর সহজলভ্য হয়েছে। কিন্তু তথ্য উৎপন্ন হওয়া আর তা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে মনিটর থাকলেও সেই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। কারণগুলো বিভিন্ন, যেমন- সরকারের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব, অথবা উচ্চ দূষণের মাত্রা প্রকাশ পেলে পর্যটন বা বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ভীতি। এছাড়া, অনেক সেন্সর কোম্পানি তাদের গ্রাহককে উৎপন্ন তথ্যের মালিকানা দেয় না, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘গ্লোবাল ফিউচার কাউন্সিল অন ক্লিন এয়ার’ এই সংকট নিরসনে পাঁচটি মূলনীতি নির্ধারণ করেছে। এই মূলনীতিগুলো সরকার, দাতা সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং সুশীল সমাজের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে।

প্রতিনিধিত্বমূলক ও টেকসই মনিটরিং নিশ্চিত করা: বায়ু পর্যবেক্ষণের জন্য মনিটরিং সিস্টেম তৈরির সময় শুরু থেকেই ‘উন্মুক্ত তথ্য’ নিশ্চিত করার শর্ত যোগ করতে হবে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন কাজ না হয়ে একটি পরিকল্পিত কাঠামোগত ডিজাইন হতে হবে।

ওপেন-রেডি সিস্টেম ও তথ্যের মালিকানা: সেন্সর কেনার সময় এমন প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম বেছে নিতে হবে, যা ক্রেতাকে তথ্যের মালিকানা দেয়। ক্রেতা যেন তার পছন্দের প্ল্যাটফর্মে তথ্যটি সবার জন্য উন্মুক্ত করতে পারে। তথ্যের মালিকানা জনগণের হাতে না থাকলে এর প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে।

তথ্যের গুণমান ও অখণ্ডতা: তথ্যের গুণমান ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মানহীন তথ্য বা ভুল তথ্য জনগণের আস্থা নষ্ট করে। তাই নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং তা উন্মুক্তভাবে শেয়ার করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

মানসম্মত প্রোটোকল ও হারমোনাইজড ফরম্যাট: তথ্য যেন একে অপরের সঙ্গে তুলনীয় হয়, সেজন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রোটোকল ও ফরম্যাট ব্যবহার করতে হবে। এতে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বয় এবং বিশ্লেষণ সহজতর হয়।

তথ্যকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর: সংগৃহীত তথ্য কেবল গবেষণার পাতায় বন্দী রাখা উচিত নয়। এই তথ্যের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বায়ু দূষণ রোধে কৌশল গ্রহণ এবং সমাধান ত্বরান্বিত করা। অর্থাৎ, ডেটা হলো নির্মল বাতাসের পথে একটি হাতিয়ার, চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বাতাসের গুণগত মান উন্নয়ন।

তথ্য উন্মুক্তকরণের কার্যকারিতা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রমাণিত। গাম্বিয়ার একটি ছোট অলাভজনক সংস্থা জাতীয় পরিবেশ সংস্থার সঙ্গে মিলে তাদের মনিটরিং নেটওয়ার্কের তথ্য উন্মুক্ত করায় দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বায়ু গুণমান আইন প্রণয়নের পথ প্রশস্ত হয়েছে। উগান্ডায় ‘এয়ারকিউ’ মডেল ব্যবহার করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জাতীয় বায়ু গুণমান নীতিমালা তৈরি করেছে। কেনিয়ার নাইরোবিতেও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্যকে শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে বায়ুর মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই সব প্রচেষ্টার অভিন্ন সূত্র হলো—তথ্য যখন মুক্ত, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সহজলভ্য এবং প্রায় রিয়েল-টাইম ভিত্তিতে শেয়ার করা হয়, তখন তা সমাজ পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখে।

বিভিন্ন অংশীজনের করণীয়:
দাতা সংস্থা: অনুদান ও প্রকিউরমেন্ট চুক্তিতে ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ডেটা’ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা যোগ করতে হবে। কোন কোম্পানিগুলো এই নীতি মেনে চলে, তার তালিকা সরবরাহ করতে হবে।

সরকার: সরকারি অর্থে পরিচালিত যেকোনো মনিটরিং ব্যবস্থার তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। স্টেশন পর্যায়ের তথ্য বাস্তব সময়ে প্রচার করতে হবে।

সেন্সর কোম্পানি: গ্রাহককে তথ্যের মালিকানা প্রদান করতে হবে যাতে তারা তা অবাধে শেয়ার করতে পারে।

সুশীল সমাজ ও গবেষক: সেন্সর কেনার আগে কোম্পানির ডেটা পলিসি যাচাই করতে হবে এবং উন্মুক্ত ডেটার মানদণ্ড নিয়ে সরব থাকতে হবে।

বায়ুর মানের তথ্যের ক্ষেত্রে এই নতুন পাঁচটি মূলনীতি কেবল একটি প্রস্তাবনা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এখন আমাদের হাতের নাগালে; সেন্সর রয়েছে, স্থানীয় নেতৃত্ব রয়েছে এবং গবেষণালব্ধ তথ্যও বিদ্যমান। যা এতদিন অভাব ছিল তা হলো তথ্যের আদান-প্রদান ও স্বচ্ছতা নিয়ে একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। পরিবেশের সুরক্ষায় আমাদের এই যাত্রায় ডেটা বিপ্লবকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন তা সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছায়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

নওগাঁয় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যু

সপ্তাহজুড়ে কেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া? জানাল অধিদপ্তর

স্তনবৃন্তে স্পর্শ করলেই কেন হঠাৎ মন খারাপ, কী এই ‘স্যাড নিপল সিনড্রোম’?

upay Rewards Three Distributor Partners with Umrah Packages under ‘Shopner Umrah 2026’ Campaign

উপায়ের ‘স্বপ্নের ওমরাহ’ ক্যাম্পেইনে পুরস্কার পেলেন ৩ ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার

সাতক্ষীরায় ৭৫ শতাংশ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে

মিরপুর বেড়িবাঁধে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৪

হাসপাতাল নেই ৬০ গ্রামে, অসুস্থ হলে আট ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি

চাঁদপুরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে ৬ যানবাহনকে জরিমানা

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা