ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২০ অগাস্ট ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য
  3. মতামত

নৌযানে তামাকের অবাধ বিক্রি বন্ধ করলেই কি তামাকমুক্ত নৌযান নিশ্চিত করা সম্ভব?

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ অগাস্ট ২০২৬, ৩:২৫ বিকাল

Link Copied!

বাংলাদেশের নৌপথ দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ লঞ্চ, ফেরি, স্টিমার ও অন্যান্য নৌযানে যাতায়াত করেন। এসব নৌযানে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, অসুস্থ মানুষ ও শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একই পরিবেশে চলাচল করেন। ফলে নৌযানে তামাকের ব্যবহার শুধু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত আচরণ নয়; এটি আশপাশের যাত্রীদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বস্তির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। তামাকমুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করার প্রশ্নে তাই শুধু ‘ধূমপান করবেন না’—এমন সচেতনতামূলক বার্তা যথেষ্ট নয়। তামাকের সহজলভ্যতা, বিশেষ করে নৌযান ও টার্মিনালকেন্দ্রিক অবাধ বিক্রি বন্ধ করা এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ—দুইটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, যেখানে তামাক সহজে পাওয়া যায় এবং আইন ভঙ্গের দৃশ্যমান শাস্তি নেই, সেখানে শুধু সচেতনতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন।

ডেভলপমেন্ট এ্যাকটিভিটিস অফ সোসাইটি (ডাস্)-এর তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন সদরঘাট থেকে প্রায় ৭০টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে চলাচল করে এবং এসব লঞ্চে প্রায় ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। একই উপাত্তে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৪,৫০০ যাত্রী টার্মিনালে অবস্থিত বিভিন্ন দোকান ও লঞ্চের ভেতরে থাকা স্থায়ী দোকান থেকে বিড়ি-সিগারেট ক্রয় করেন। প্রতি চারজন যাত্রীর মধ্যে একজন ধূমপান করেন এবং একজনের ধূমপানের কারণে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। এই চিত্র আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করায়—ধূমপানমুক্ত নৌপরিবহন নিশ্চিত করতে আমরা কি শুধু ধূমপায়ীর দিকে তাকাব, নাকি তামাকের সরবরাহ ব্যবস্থাকেও নিয়ন্ত্রণ করব? বাস্তবতা হলো, শুধু একজন যাত্রীকে ধূমপান না করতে বললেই সমস্যার সমাধান হবে না। তামাকজাত দ্রব্য যদি টার্মিনাল, নৌযান কিংবা আশপাশের দোকানে সহজলভ্য থাকে, তাহলে ধূমপান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হবে। তাই নৌযানে ধূমপান বন্ধের পাশাপাশি তামাকের অবাধ বিক্রি, সরবরাহ ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

তামাকের ক্ষতি শুধু ধূমপায়ীর নয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষ তামাক ব্যবহার করছিলেন। তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর ৭ মিলিয়নের বেশি মানুষ মারা যায়; এর মধ্যে ১৬ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি ধূমপান না করেও পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে এসে মৃত্যুবরণ করেন। WHO আরও বলছে, তামাক শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপ্রবণতা তৈরি করে। নৌযানে এ ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি লঞ্চ বা ফেরির সীমিত জায়গায় একজন ব্যক্তি ধূমপান করলে তার আশপাশের যাত্রীরাও ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসতে পারেন। শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য এমন পরিবেশ বিশেষভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত। WHO-এর মতে, তামাকের ধোঁয়ায় হাজার হাজার রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যার অনেকগুলো ক্ষতিকর এবং বহু উপাদান ক্যানসার সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। WHO-এর Global Adult Tobacco Survey (GATS) Bangladesh 2017 অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের তামাক ব্যবহারের হার ২০০৯ সালের ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছিল। একই সময়ে গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৪৪ শতাংশে কমে। অগ্রগতি হলেও ২০১৭ সালের তথ্যই দেখায় যে গণপরিবহন ছিল তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অর্থাৎ, গণপরিবহন ও নৌযানকে কার্যকরভাবে তামাকমুক্ত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইন সংশোধন হয়েছে, এবার প্রয়োজন বাস্তব প্রয়োগ

বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে সংশোধনের মাধ্যমে আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে তামাক ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিধান আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। নির্ধারিত ধূমপান এলাকা বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং সব ধরনের তামাকের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা হয়েছে এবং আইন ভঙ্গের শাস্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়াও সংশোধিত এই আইনে পাবলিক প্লেসের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। নৌবন্দর, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনালসহ জনগণের সম্মিলিত ব্যবহারের বিভিন্ন স্থান এর আওতায় এসেছে। একই সঙ্গে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আইন লঙ্ঘনের জরিমানা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা করা হয়েছে। আইনগতভাবে এগুলি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু আইন যত শক্তিশালীই হোক, প্রয়োগ দুর্বল হলে তার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। একজন যাত্রী যদি নৌযানে উঠে দেখেন কেউ প্রকাশ্যে ধূমপান করছেন অথচ কেউ তাকে বাধা দিচ্ছে না, তাহলে তার কাছে আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একইভাবে, টার্মিনালের দোকানে অবাধে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি চলতে থাকলে শুধু ‘ধূমপান নিষেধ’ সাইনেজ লাগিয়ে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে আইন শুধু কাগজে কলমেই থাকবে; বাস্তবে নয়।

তামাকের অবাধ বিক্রি কেন বন্ধ করা জরুরি?

তামাকমুক্ত নৌপথের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো তামাকজাত পণ্যের সহজলভ্যতা। লঞ্চঘাট, টার্মিনাল, নৌযান সংলগ্ন দোকান ও আশপাশের বাজারে যদি সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ বিভিন্ন তামাকজাত পণ্য সহজেই পাওয়া যায়, তাহলে নৌপথকে তামাকমুক্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে সহজলভ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। WHO Framework Convention on Tobacco Control-এর Article 16 তামাকজাত পণ্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রি বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেয় এবং ছোট প্যাকেট বা এককভাবে বিক্রির মতো পদ্ধতি নিয়েও সতর্ক করে, কারণ এগুলো তামাককে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তামাকের ব্যাপক ব্যবহার একটি বাস্তব জনস্বাস্থ্য সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে বাংলাদেশে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের হার প্রায় ২০ শতাংশের বেশি ছিল; ২০১৭ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি গবেষণায় বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী থাকার হিসাব পাওয়া যায়। তাই তামাকমুক্ত নৌপথের অর্থ শুধু লঞ্চ বা ফেরির ভেতরে কেউ সিগারেট ধরাবেন না—এতটুকু নয়। নৌযান, ঘাট, টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় তামাকের বিক্রি ও প্রচারের সুযোগও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

তামাক বিক্রি বন্ধ না করলে ধূমপানমুক্ত নৌপথ কঠিন

ধূমপানমুক্ত নৌপরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্তগুলোর একটি হলো তামাকের সহজলভ্যতা কমানো। কারণ কোনো পরিবেশে তামাকজাত দ্রব্য যত সহজে পাওয়া যায়, সেখানে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ তত কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়স্থল বা Point of Sale-এ বিজ্ঞাপন ও প্রদর্শনের ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু সংবেদনশীল স্থানের আশপাশেও তামাক বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে। নৌপরিবহনের ক্ষেত্রে টার্মিনালের দোকান, ক্যান্টিন, ভাসমান দোকান এবং নৌযানের ভেতরে সম্ভাব্য বিক্রয়ব্যবস্থাকে নিয়মিত নজরদারিতে আনতে হবে। কোথায় তামাক বিক্রি হচ্ছে, কারা বিক্রি করছে, কারা সরবরাহ করছে এবং কীভাবে এসব পণ্য নৌযানে প্রবেশ করছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনায় যাত্রীবাহী নৌযানে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ছাড়াও তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি ও পরিবহনের বিষয়ে নির্দেশনার বিষয়টি রয়েছে। অর্থাৎ নৌযানে তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু ‘কে ধূমপান করছে’ তা দেখলে চলবে না; ‘তামাক কোথা থেকে আসছে’—এই প্রশ্নটিও সামনে আনতে হবে।

দৃশ্যমান আইনের প্রয়োগ ও নিয়মিত মনিটরিং ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান সাইনেজ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান বিধিমালায় পাবলিক প্লেস ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে সতর্কীকরণ নোটিশ প্রদর্শনের বিধান রয়েছে। তাই প্রতিটি লঞ্চ, ফেরি ও টার্মিনালে আইনসম্মত এবং দৃশ্যমান ‘ধূমপান নিষেধ’ সাইনেজ থাকা প্রয়োজন। তবে একটি ছোট স্টিকার লাগিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রবেশপথ, টিকিট কাউন্টার, অপেক্ষমাণ স্থান, যাত্রী বসার জায়গা, কেবিন, ডেক, সিঁড়ি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত সাইনেজ স্থাপন করতে হবে। বাংলা ভাষায় স্পষ্ট বার্তার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ইংরেজিও ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু সাইনেজ তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিং ও আইন প্রয়োগ থাকবে। তাই সাইনেজ আছে কি না, দৃশ্যমান কি না এবং নষ্ট বা অকার্যকর হয়ে গেছে কি না—এসব বিষয়ও নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত মনিটরিং। শুধু বিশেষ দিবস, প্রচারাভিযান বা কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করলে হবে না। প্রতিদিনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মনিটরিং ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। নৌযানের মালিক, মাস্টার, চালক, কর্মচারী ও টার্মিনাল কর্তৃপক্ষকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে অবহিত করতে হবে। কোথায় ধূমপান বা তামাক ব্যবহার নিষিদ্ধ, কোথায় বিক্রি নিষিদ্ধ এবং আইন ভঙ্গ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে দায়িত্ব নির্দিষ্ট করতে হবে। WHO-এর FCTC বাস্তবায়ন নির্দেশনাতেও আইন প্রয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ, জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।

সুতরাং নৌপথে কার্যকর আইন প্রয়োগের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি—নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, আইন ভঙ্গের নথি সংরক্ষণ, পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়।

শুধু যাত্রী নয়, কর্মীদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে

তামাকমুক্ত নৌপথ বাস্তবায়নে শুধু যাত্রীদের সচেতন করলে চলবে না। লঞ্চের মাস্টার, চালক, সারেং, টিকিট বিক্রেতা, হেলপার, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং দোকানদারদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিটি নৌযানে একজন বা একটি দায়িত্বপ্রাপ্ত টিম থাকতে পারে, যারা তামাকমুক্ত নীতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে। যাত্রী ধূমপান করলে বিনয়ের সঙ্গে সতর্ক করা, প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে নৌযানের কর্মীদের প্রশিক্ষণে তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি, আইন, আইন প্রয়োগের পদ্ধতি এবং যাত্রীদের সঙ্গে আচরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

টার্মিনাল ও ঘাটকে ‘তামাকমুক্ত প্রবেশদ্বার’ করতে হবে

নৌপথকে তামাকমুক্ত করতে হলে শুধু নৌযান নয়, নৌযানের যাত্রা শুরু ও শেষ হওয়ার স্থান—টার্মিনাল ও ঘাটকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ঘাটের প্রবেশপথ, টিকিট কাউন্টার, অপেক্ষমাণ এলাকা, যাত্রী ছাউনি, প্ল্যাটফর্ম, খাবারের দোকান এবং নৌযানের আশপাশে তামাকজাত পণ্যের বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ২০২৬ সালের সংশোধিত আইন তামাক নিয়ন্ত্রণে আরও বিস্তৃত সুরক্ষা তৈরি করেছে। এর মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিশুদের পার্ক ও ক্রীড়া স্থাপনার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিধানও রয়েছে। এই নীতির আলোকে নৌটার্মিনাল ও জনসমাগমস্থলে তামাকের সহজলভ্যতা কমানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

তামাকমুক্ত নৌপথ অর্থ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবহন

একটি তামাকমুক্ত নৌপথ শুধু স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও নিরাপদ গণপরিবহনেরও অংশ। একজন যাত্রী টিকিট কিনে নৌযানে ওঠার পর অন্যের ধূমপানের কারণে ক্ষতিকর ধোঁয়া গ্রহণ করতে বাধ্য হবেন—এটি গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। বিশ্বব্যাপী তামাক নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে মূলত শক্তিশালী নীতিমালা, কর ও মূল্যনীতি, বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা, ধূমপানমুক্ত পরিবেশ এবং আইন প্রয়োগের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে। WHO-এর ২০২৫ সালের Global Tobacco Epidemic Report-ও দেখিয়েছে, কার্যকর MPOWER ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বহু দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশেও তাই তামাকমুক্ত নৌপথকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রচারাভিযান হিসেবে না দেখে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশের নৌপথকে সত্যিকার অর্থে তামাকমুক্ত করতে হলে শুধু সাইনবোর্ড, পোস্টার বা প্রচারাভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তামাকের অবাধ বিক্রি কমানো, নৌযান ও টার্মিনালে তামাক ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ—এই তিনটি বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক গবেষণা ও WHO-এর তথ্য স্পষ্ট করে যে তামাক একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরোক্ষ ধূমপান থেকেও মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এই সুরক্ষা বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।এখন প্রয়োজন আইনকে কাগজ থেকে বাস্তবে নিয়ে আসা। নৌযানে ধূমপান বন্ধ, তামাকজাত পণ্যের অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত মনিটরিং, দ্রুত আইন প্রয়োগ এবং জনসম্পৃক্ততার সমন্বিত উদ্যোগই পারে দেশের নৌপথকে একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যবান্ধব ও তামাকমুক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে। তামাকমুক্ত নৌপথ কোনো বিলাসিতা নয়—এটি যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং একটি নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থার মৌলিক দাবি।

লেখক: মোয়াজ্জেম হোসেন টিপু, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মী।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

কলেরা হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মনো-সামাজিক পরিচর্যায় পুলিশকে প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগীকে উন্নত সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব

মানুষের বদলে দেওয়া পৃথিবীতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রাণিজগৎ

রোগ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস, কোথাও হতে পারে ভারী বর্ষণ

জাপানে ট্রেনের ধাক্কায় চার রেলশ্রমিক নিহত

স্বর্ণের দাম আবারও বাড়ল, ভরি কত?

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিস্কুট উৎপাদন, বেকারিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা

ঢাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ১ হাজার ৮৪১ মামলা

তিস্তার ভাঙনে বিলীন স্কুল, পরে ফেলা হচ্ছে জিওব্যাগ

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা, বরগুনা পৌরসভায় বাড়ছে জনভোগান্তি

দুপুরের মধ্যে ৬ জেলায় ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা