
রাতভর টানা ভারী বর্ষণে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হয়েছে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে তিস্তা, মহানন্দা, তোর্সা ও জলঢাকা নদী। অন্তত ১০টি জেলায় বন্যা ও ধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হলেও, বেসরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে।
আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতভর পাহাড় ও সমতলে ভারী বর্ষণ হয়। এতে নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা বাজার ও রবিঝোরায় নদীর পানি উঠে এসেছে সড়ক পর্যন্ত, বহু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরসহ ১০ জেলায় জারি করা হয়েছে লাল সতর্কতা। এসব এলাকায় ধসের কারণে সড়ক, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
ধসে ভেঙে পড়েছে একাধিক সেতু ও রাস্তা। দার্জিলিং-সিকিম সংযোগকারী ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক, শিলিগুড়ি-দার্জিলিং ৫৫ নম্বর সড়ক এবং দার্জিলিং-কালিম্পং ও শিলিগুড়ি-কালিম্পংয়ের সব রুট বন্ধ রয়েছে। মিরিকের ঐতিহ্যবাহী দুধিয়া সেতু ভেঙে পড়ায় শিলিগুড়ির সঙ্গে মিরিকের যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
মিরিকের সৌরেনি এলাকায় পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আরও চারজন ধসে চাপা পড়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে সিভিল ডিফেন্স টিম ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা দল (এনডিআরএফ)। তবে টানা বৃষ্টির কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।
আচমকা সৃষ্ট এই দুর্যোগে দার্জিলিং প্রশাসন সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে। টাইগার হিল, রক গার্ডেনসহ জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া বহু পর্যটক আটকা পড়েছেন, সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় কেউই নির্ধারিত সময়ে রেলস্টেশন বা বিমানবন্দরে পৌঁছতে পারছেন না। দার্জিলিংয়ের পুলিশ সুপার প্রবীণ প্রকাশ পর্যটকদের আপাতত ভ্রমণ বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন।
সমতলেও ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। শিলিগুড়ির পোড়াঝাড় এলাকায় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফুলবাড়ির মহানন্দা ক্যানেল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন গলগলিয়া ও হাসিমারায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে-শুধু হাসিমারাতেই সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। তোর্সা নদীর জলস্তর বিপৎসীমার ১১৮ মিটার ওপরে উঠে গেছে, ফলে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারেও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জলপাইগুড়িতে একরাতে ১৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা এ বছরের সর্বোচ্চ। ভুটান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার, পুলিশ, দুর্যোগ মোকাবিলা টিম ও সেনা সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় আগাম সতর্কতা ও পদক্ষেপ গ্রহণে ভুটান সরকারও পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।