
সরকার গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে যে বাজেট প্রস্তাব দিয়েছে সেটাতে কোনোভাবেই তামাকজাত দ্রব্যের দাম কাংখিত পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়নি বরং নতুন দুই ধরণের তামাক পণ্যকে করের আওতায় এনে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর (ই-সিগারেট, ভেপ ইত্যাদি) বৈধকরণ এবং তামাকজাত দ্রব্যের সামান্য মূল্য বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যকে মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
জনস্বাস্থ্যকে আমলে না নিয়ে কোম্পানির হস্তক্ষেপে প্রথমে আইন থেকে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্য নিষিদ্ধের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। তারপর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও পরামর্শ উপেক্ষা করে করের আওতায় এনে এসব পণ্যকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতিসহ দেশের কোটি কিশোর-তরুণ নতুন নেশার ফাঁদে আটকে পড়বে। শুধুমাত্র নামমাত্র রাজস্ব আয় বিবেচনায় নিয়ে এমন ক্ষতিকর নেশাকে বৈধতা দেওয়ায় মানুষ হতাশ হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় তামাকজাত দ্রব্যে অ্যাডভেলরেমের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট করারোপের দাবি জানিয়েছিলেন দেশের জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সরকার কেবল সিগারেটের যৎসামান্য মূল্য বাড়িয়েছে। সিগারেটের ১০ শলাকার মূল্য নিম্ন স্তরে ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৮০ টাকা থেকে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অতিউচ্চ স্তরে ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা করা হয়েছে। বাজারে সিগারেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ বিক্রি হয় নিম্ন স্তরের সিগারেট। এই স্তরের মূল্য মাত্র ২ টাকা বা ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। তাই সামান্য মূল্য বৃদ্ধি নিম্ন স্তরের সিগারেটকে আরো সহজলভ্য করবে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর সরকার তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর হার বৃদ্ধি করে থাকে। কিন্তু নিম্ন স্তরের সিগারেটের নামমাত্র মূল্য বৃদ্ধিতে ধূমপানের হার বৃদ্ধি পাবে পাশাপাশি অন্যান্য স্তরের সিগারেটের ভোক্তারা নিম্ন স্তরের সিগারেট সেবন শুরু করবে। ফলে ধূমপানের প্রবণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। বহুল ব্যবহৃত সিগারেটের সামান্য মূল্য বৃদ্ধি সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যকেও পূরণ করবে না বরং সুনির্দিষ্ট কর আরোপ না করায় তামাক কোম্পানির মুনাফা অযাচিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে বাজেট প্রস্তাবনা থেকে ‘ও তদুর্ধ্ব’ শব্দটি বাতিল না করায় মূল্য কারসাজির মাধ্যমে তামাক কোম্পানির রাজস্ব ফাঁকি ও মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ থেকে যাবে।
ইতোমধ্যে এই নজির মাঠ পর্যায়ে দেখাও যাচ্ছে। সরকার নিম্ন স্তরের সিগারেটের মূল্য ১০ শলাকার মূল্য ৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও বহুজাতিক কোম্পানি নির্ধারণ করেছে ৭২ টাকা। সরকারের দাম অনুযায়ী প্রতি শলাকা সিগারেটের মূল্য হয় ৬.২ টাকা। কিন্তু বাজারে কি খুচরা শলাকার প্রচলন আছে? ফলে কোম্পানি সরকারের নীতির সুবিধা নিয়ে অবৈধভাবে প্রতি শলাকার মূল্য নির্ধারণ করেছে ৭, ৮ টাকা! এই যে বাড়তি মূল্যে সিগারেট বিক্রি করা হচ্ছে এই অর্থের কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো।
বাজেট প্রস্তাবে নিম্ন স্তরের সিগারেটের নামমাত্র মূল্য বৃদ্ধি, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচকে বৈধতা প্রদান, বিড়ি, জর্দা ও গুলের মূল্য বৃদ্ধি না করা জনস্বাস্থ্যে প্রশ্নে আমাদের পেছনের দিকে চলার উদাহারণ হয়ে থাকবে। এসব সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে নেতিবাচক।
তবে সিগারেটের ট্যাক্স স্ট্যাম্পে কিউআর কোড ব্যবহার, ডিজিটাল ট্রাক ও ট্রেস ব্যবস্থার প্রচলণ, সিগারেট ও বিড়ির কাগজের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ কয়েকটি প্রস্তাবের প্রশংসা করতেই হবে। তবে এক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ কোম্পানিগুলো নানাভাবে এসব সুযোগের অপব্যবহার করবে।
তামাকজাত দ্রব্যের করারোপে অ্যাডভেলোরেম পদ্ধতির পাশাপাশি ‘সুনির্দিষ্ট কর’ আরোপ করা হলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি, তামাকের ব্যবহার হ্রাস ও কর ফাঁকি প্রতিরোধেও কার্যকর অবদান রাখতো এবং নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো বৈধতা দেওয়া না হলে কোটি তরুণ সুরক্ষিত থাকতো। তামাকের ক্ষেত্রে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনো সময় আছে এনবিআরকে তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের কর প্রস্তাব অনুসারে বাজেট প্রস্তাব সংশোধন করতে হবে এবং সরকারকে এ বিষয়ে আরও আন্তরিক হতে হবে।
লেখক : ইব্রাহীম খলিল, সিনিয়র প্রজেক্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার, বিএনটিটিপি।