
ফ্রান্সের জাতীয় রক্ত সরবরাহ সংস্থার (ইএফএস) তিনটি আঞ্চলিক রক্ত সংরক্ষণাগারে সাইবার হামলা চালিয়েছে হ্যাকাররা। হামলার মাধ্যমে রক্ত ও প্লাজমা সংরক্ষণের হিমাগারের তাপমাত্রা এবং বরফ গলানোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ রক্ত উপাদান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলেও সতর্কতামূলক অ্যালার্মের কারণে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। ফলে কোনো রক্ত বা প্লাজমা নষ্ট হয়নি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ফ্রান্সের জাতীয় রক্ত সরবরাহ সংস্থা ইএফএস জানায়, সোমবার রাতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হ্যাকাররা তিনটি হিমাগারের তাপমাত্রা ও ডিফ্রস্টিংয়ের নির্ধারিত সীমা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পরিবর্তন করে দেয়। তবে পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতামূলক অ্যালার্ম ব্যবস্থায় অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হওয়ার পর কর্মীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।
সংস্থাটি জানায়, আক্রান্ত সংরক্ষণাগারগুলোতে রক্ত সঞ্চালনের জন্য ব্যবহৃত প্লাজমার ব্যাগ এবং ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহৃত প্লাজমা রাখা ছিল। ঝুঁকি এড়াতে এসব উপাদান অন্য নিরাপদ সংরক্ষণাগারে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে কোনো রক্তের উপাদান নষ্ট হয়নি এবং এ ঘটনায় কোনো স্বাস্থ্যগত ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি।
ফ্রান্সের ইএফএস দেশটির সরকারি রক্ত সংগ্রহ, পরীক্ষা, প্রস্তুত ও বিতরণকারী সংস্থা। দেশটির ১ হাজার ৯০০টির বেশি হাসপাতালে রক্ত, প্লাজমা ও প্লাটিলেট সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। বছরে ১০ লাখের বেশি রোগীকে সেবা দেয় সংস্থাটি।
ফ্রান্সের রক্ত সংরক্ষণাগারে হামলার ঘটনাটি ইউরোপজুড়ে রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ধারাবাহিক সাইবার হামলার মধ্যে ঘটেছে। এর আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সুপারমার্কেটের হিমাগার ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে বাড়িয়ে দিয়েছিল হ্যাকাররা। এতে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য নষ্ট হয় এবং কয়েক মিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ক্ষতি হয়।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনে সুপারমার্কেটের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় সমস্যার খবর পাওয়া যায়। পরদিন ইতালি, জার্মানি, রোমানিয়া ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের হামলার শিকার হয়।
এর আগে গত মাসে ফ্রান্সের প্রায় ৭০০ সুপারমার্কেটের শীতলীকরণ ইউনিটের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে চলে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়টি সামরিক ঘাঁটির সুপারমার্কেটেও আগস্টের শুরুতে একই ধরনের রহস্যজনক ফ্রিজ বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার সঙ্গে সাইবার হামলার যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্ত করছে পেন্টাগন।
ফ্রান্সের রক্ত সংরক্ষণাগারে হামলার উদ্দেশ্য বা এর পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হামলার দায়ও স্বীকার করেনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র থমাস রেনিয়ের জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সাইবার হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সংস্থা জাতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি আলোচনা করছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব হামলার পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কোনো তৎপরতা থাকতে পারে। তবে কোনো একক হ্যাকার নিজের সক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেও এমন হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাণিজ্যিক হিমাগারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু এসব যন্ত্রের সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দুর্বলতা সময়মতো সংশোধন বা আপডেট না করলে হ্যাকাররা সহজেই নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
এদিকে ফ্রান্সের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা (এএনএসএসআই) এবং দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে হামলার বিষয়ে জানানো হয়েছে। ইএফএস জানিয়েছে, তাদের সব ধরনের সরঞ্জামের ওপর নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা হয়েছে। সংস্থাটির রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রমও স্বাভাবিক রয়েছে।